বাঁহাতি সৌরভের মাঠে বাঁহাতিদেরই দাপট!

Spread the love

কাশীনাথ ভট্টাচার্য

কলকাতা, ১২ এপ্রিল ২০১৯

কলকাতা – ১৭৮/৭ (গিল ৬৫, রাসেল ৪৫)

দিল্লি – ১৮০/৩ (ধাওয়ান ৯৭*, পন্থ ৪৬)

এসজি-র মাঠে ম্যাচ জিততে চেয়েছিলেন আর এক এসজি! শেষ পর্যন্ত বাঁহাতির মাঠ থেকে গেল বাঁহাতিদেরই। সৌরভ গাঙ্গুলির ইডেন থেকে ম্যাচ নিয়ে গেলেন শিখর ধাওয়ান ও ঋষভ পন্থ, দুই বাঁহাতি!

ভারতে সবই সম্ভব, টোয়েন্টি টোয়েন্টি দেখে ফিফটি-ফিফটি বিশ্বকাপের দল নির্বাচনও। তাই আইপিএল এখন বিশ্বকাপের বিমানে জায়গা পাওয়ার প্রতিযোগিতা। শিখর ‘গব্বর’ ধাওয়ানের ব্যাটে রান ছিল না। কলকাতায় এসে কেকেআর-কে তাদের ডেরায় হারিয়ে টলোমলো আসনটা স্থির। শতরান পেলেন না, সঙ্গী কলিন ইনগ্রাম ছয় মেরে সাত বল বাকি থাকতে সাত উইকেটে জয় এনে দেওয়ায়। কিন্তু, এই ৬৩ বলে অপরাজিত ৯৭ শিখরকে দিল সন্তুষ্টি আর বিপক্ষের মনে ছড়াল ভয়। কুড়ি ওভার মাঠে থেকে যাওয়ার এই ইচ্ছেডানায় ধাওয়ান সওয়ার হলে বিপক্ষের মুশকিল, দিল্লির মুশকিল-আসান!

সঙ্গে ঋষভ পন্থ। তাঁর সঙ্গে লড়াই আবার দীনেশ কার্তিকের। দ্বিতীয় উইকেটরক্ষক এবং ব্যাটসম্যানের জায়গা নিয়ে। সম্মুখসমরে কেকেআর অধিনায়ককে পেয়ে রবি উথাপ্পার অবিশ্বাস্য ক্যাচ নিয়ে ফেলেন পন্থ, অনেকটা লাফিয়ে, প্রায় গাছ থেকে আম পেড়ে নেওয়ার ভঙ্গিতে। পৃথ্বী শ-র ক্যাচটা নিজের ডানদিকে লাফিয়ে প্রথম স্লিপের জায়গায় পৌঁছে কার্তিক বোঝাতে চেয়েছিলেন, কম যান না। কিন্তু তরুণ ঋষভের অকুতোভয় ব্যাটিং অন্তত এই ম্যাচে কার্তিককে ভুলিয়ে দিতে যথেষ্ট। সে তিনি যতই তারুণ্যের অতিরিক্ত উচ্ছ্বাসে উইকেট ছুড়ে দিয়ে ফিরুন না কেন। ৩১ বলে ৪৬, চারটি চার ও দুটি ছয়, সর্বোপরি শিখরের পরামর্শে অনেকক্ষণ নিজের স্বভাবসিদ্ধ সব-বলে মারতে চাওয়ার ইচ্ছেতে লাগাম রেখে।

ক্রিস লিনের ফ্লু হওয়ায় শুভমান গিল সুযোগ পেয়েছিলেন কেকেআর ইনিংসের শুরুতে। ৩৯ বলে ৬৫, দুটো ওভার বাউন্ডারি, সাতটা বাউন্ডারি। অযথা হাঁকপাঁক নেই। প্রতি বলে ছয় মারতেই হবে, নেই এমন মরিয়া মনোভাবও। বয়স ১৯, মাথার বয়স ৩৮ ধরাই যায়, এমন ইনিংসের পর। মন জিতে নিলেন শুভমান হাজার চুয়ান্নর ইডেন-গ্যালারির। অন্যপ্রান্তে ইংরেজ জো ডেনলির প্রথম বলেই বোল্ড হওয়ার পর রবি উথাপ্পাকে সঙ্গে নিয়ে সাজালেন ইনিংস। যদিও এই ‘সাজালেন’ শব্দটা টি টোয়েন্টির সঙ্গে মানানসই নয়, কিন্তু শুভমানের ইনিংসের সঙ্গে বিধ্বংসী শব্দটাও যে কিছুতেই যাচ্ছে না!

আসলে কেকেআর-এর ২০১৯ অভিযানে বিধ্বংসী, ঝড় এই সব বিশেষণই বিশেষ একজনের ক্ষেত্রে সুপ্রযুক্ত। আন্দ্রে রাসেল। সমাজমাধ্যমে নাম ছোট করে ডাকার অধুনা দৌরাত্ম্যে যিনি ‘দ্রে রাস’!

১২ দশমিক চার ওভারে এসেছিলেন। দল তখন তিন উইকেটে ৯৩। ফিরলেন ১৮ দশমিক দুই ওভারে, দলকে ১৬১ রানে পৌঁছে দিয়ে। তিনি উইকেটে থাকাকালীন ৬৮ রান জুড়ল কেকেআর। রাসেলের নিজের ৪৫, স্বভাবসিদ্ধ ২১ বলে। তিনটি চার এবং চারটি ছয়। কার বিরুদ্ধে সবচেয়ে সফল, বলে দেওয়ার জন্য পুরস্কার নেই। কাগিসো রাবাদা। দক্ষিণ আফ্রিকার সেই জোরে বোলার যিনি দিল্লির মাঠে সুপার ওভারে ইয়ার্কারের পর ইয়র্কার দিয়ে সেই দিনের মতো জিতিয়েছিলেন দলকে, রাসেলকে বেঁধে রেখে। এবার?

৪-০-৬-১-৬-২-৬-১-০, মোট ২৬ রান, ৯ বলে! ঘরের মাঠে বদলা নিলেন রাসেল। ৪ ওভাবে ৪২ রান দিলেন রাবাদা। হ্যাঁ, রাসেলের আউটে তাঁরও অবশ্যই অবদান রইল। ক্রিস মরিসের অফস্টাম্পের বাইরের বল সজোরে মেরেছিলেন রাসেল, যেমন মেরেই থাকেন। বল সোজা রাবাদার গলার উচ্চতায়, হাতে। তার আগে অবশ্য একবার দেশ ও কেকেআর-সতীর্থ কার্লোস ব্র্যাথওয়েটকে অনেকটা টেনিসের জোরালো ফোরহ্যান্ডের ঢঙে মারা শটে ননস্ট্রাইকার প্রান্তে আহত করেছিলেন, নিজের মারা শটে বল নিজের পায়েই লেগে যাওয়ায় চোট পেয়েছিলেন নিজেও। কিন্তু ১২০ বলের ক্রিকেটে তাঁর এই ১৩-১৭-১৯-২১ বলের ইনিংসগুলোই টেনে নিয়ে আসছে মানুষকে, মাঠে।

উথাপ্পা আউট হওয়ার পর কেকেআর ইনিংসে বাউন্ডারির খরা চলেছিল। ৬.৪ ওভারে বাউন্ডারির পর ১১.৩ ওভারে ছয় শুভমানেরই। মাঝে ২৯ বলের ব্যবধান, যা বোধহয় এবারের কেকেআর ব্যাটিংয়ে সবচেয়ে বেশি বল বাউন্ডারিহীন। শুভমানের সঙ্গে ৫১ বলে ৬২ রানের জুটি উথাপ্পার (৩০)। রাসেল আউট হওয়ার পর শেষ দশ বলে ব্র্যাথওয়েট নিজেকে নিয়ে যেতে পারেননি ইডেনে টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ফাইনালের ফর্মে, যখন বেন স্টোকসকে শেষ চার বলে চারঠি ছয় মেরে জিতিয়েছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজকে। অন্তত ১৫ রান কম হয় ইডেনের দুর্দান্ত উইকেটে।

সৌরভের উপস্থিতিতে দিল্লি আত্মবিশ্বাসী ছিল, রান তুলে নেওয়া সম্ভব। সেই কাজটা সহজ হয়ে যায় ধাওয়ান শেষ পর্যন্ত থেকে যাওয়ায়। টি টোয়েন্টিতে তাঁর শতরান এখনও অধরাই। কিন্তু, কেকেআর-এর বিরুদ্ধে মহামূল্যবান দুটি ম্যাচেই জয়ের পর পয়েন্টেও (৮) কলকাতাকে ছুঁয়ে ফেলল দিল্লি।

আগামী রবিবার, বাংলা নববর্ষের ঠিক আগের দিন, কলকাতার সামনে আরও বড় পরীক্ষা এখন, মেজাজ হারিয়ে বিতর্কে সামিল মহেন্দ্র সিং ধোনির চেন্নাই সুপার কিংসের বিরুদ্ধে।

খেলাশেষে নায়ক ধাওয়ানকে অভিনন্দন উথাপ্পার, শুক্রবার রাতে, ইডেনে। ছবি – আইপিএল

Kashinath Bhattacharjee
Covered two FIFA World Cups in Brazil (2014) and Russia (2018), UEFA Champions League Final in Moscow (2008). In Sports Journalism since 1993. twitter: @bkashi
https://www.facebook.com/kashinath.bhattacharjee

Leave a Reply