সব ভয়ঙ্কর-বীভৎস-ভীষণ-এর বিরোধিতায় এবার পানেনকা ফ্রিকিক মেসির

Spread the love

কাশীনাথ ভট্টাচার্য

কলকাতা, ৩০ মার্চ ২০১৯

পানেনকা পেনাল্টি, ফুটবলপ্রেমীরা জানেন। ফ্রিকিক-এ পানেনকা? দেখালেন লিওনেল মেসি!

কাতালান-ডার্বিতে, এসপানিওলের বিরুদ্ধে। ঘরের মাঠ কাম্প নু-তে। ম্যাচ তখন ৭১ মিনিটে। বক্সের ঠিক বাইরে ফাউল করা হয়েছিল তাঁকে। ০-০ ম্যাচ তখন। ১৮ গজের ঠিক বাইরে থেকে ফ্রিকিকে জোর আনা সম্ভব হলেও দিশায় নিখুঁত থাকা কঠিন। সুতরাং, মেসির মাথা ভেবে নিল, পা করে দেখাল!

আলতো চিপ করে দিলেন, মানব-দেওয়াল টপকে। ফাউল করেছিলেন যিনি, এসপানিওল অধিনায়ক,  দেওয়ালে দাঁড়িয়েও পিছিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর গোলরক্ষক যেহেতু দূরের পোস্টে দাঁড়িয়েছেন, পিছিয়ে গিয়ে তিনি প্রথম পোস্টে বল এলে হেড করে বের করে দেবেন, আশায়।

বার্সেলোনা-অধিনায়কের আলতো চিপ তাঁর মাথায়ই পড়ল। কিন্তু, তিনি ততক্ষণে ঘাবড়ে গিয়েছেন। কী করে অত আস্তে একটা বল আসতে পারে! কিছু বোঝার আগে ডিফেন্ডারের অবচেতন মাথা ঘুরিয়ে ফেলল। বল সেই মাথায় লেগে জালে। গোলরক্ষক দ্বিতীয় পোস্ট থেকে হাত বাড়িয়ে ছুটে আসছিলেন। কিছু করার ছিল না তাঁরও।

সবাই বিহ্বল! এমনও হয়! করে দেখানো যায়! এত সহজে, এত কঠিন কাজ!

লিওনেল মেসি মানে এখন তা-ই। যা করেছেন এবং যা করে চলেছেন প্রতিদিন, খুলছে ইতিহাসের নতুন পাতা। রেয়াল বেতিসের বিরুদ্ধে আগের ম্যাচে বক্সের মাথা থেকে এভাবেই ‘পানেনকা’ গোল করেছিলেন, খেলা চলাকালীন। তখন বেশি কথা ওঠেনি যদিও, সেট পিস ছিল না বলেই। বেতিসের ফুটবলাররা তো বটেই, গোটা মাঠ উঠে দাঁড়িয়ে অভিনন্দিত করেছিল। জীবনের ৫১তম হ্যাটট্রিকের জন্য নয়। যেভাবে ফুটবল খেলছেন তিনি, সে জন্য।

কেমন এ ফুটবল?

দেখুন, মুগ্ধতা বাড়বে। গত প্রায় বছর পনের হতে চলল, নিজেকে গড়ছেন নিরন্তর। আরও সুন্দর হয়ে উঠছেন। অনেকে নেতিবাচক ‘ভয়ঙ্কর’ জুড়ে ফেলেন চূড়ান্ত ইতিবাচক ‘সুন্দর’-এর সঙ্গে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কী ভেবে লিখেছিলেন, কেন অমন ব্যবহার করেছিলেন, সবার পক্ষে বোঝা সম্ভব কি? কিন্তু, বাংলায় এখন খুবই প্রচলিত এই ব্যবহার। ‘বীভৎস সুন্দর’-ও শোনা যাচ্ছে শিক্ষিত-রাস্তায় আর ‘আরজে’ অর্থাৎ রেডিও জকি-র এফএম বাংলায়। বীভৎস রকমের বেখাপ্পা!

মেসির ফুটবল এই সব ভয়ঙ্কর-বীভৎস-ভীষণ-এর বিরোধিতা করে, নিঃশব্দে। হুঙ্কার-আস্ফালন নেই। ক্লাবের লোগোয় ছোট্ট চুমু। সেই ক্লাব যা তাঁকে জীবন দিয়েছিল ফিরিয়ে। বিরাট খরচের চিকিৎসা, না করালে সহজভাবে বেঁচে থাকা যেত না। প্রতিদান দিয়ে চলেছেন আজও।

মরসুমে ৩৮ ম্যাচে ৪১ গোল, ১৮ অ্যাসিস্ট। মোট ৫৯ গোলের পেছনে তাঁর পা, শনিবারের জোড়া গোলের পর। লা লিগায় ৩৩৪তম ম্যাচ জিতে ছুঁয়ে ফেললেন ইকের কাসিয়াসকে, পেরিয়ে যাবেন অচিরেই। টানা এগার মরসুম ৪০-এর বেশি গোল করে ফেললেন।

৮০৪ ম্যাচ, ৬৫৮ গোল, ২৭০ অ্যাসিস্ট! মানে, ৮০৪ ম্যাচে ৯২৮ গোলে সরাসরি অবদান!

অন্য কারও হলে অবিশ্বাস্য মনে হতেও পারত। মেসির জন্য তা-ও নয়। জেরোম বোয়াতেংকে কাটা কলাগাছের মতো শূন্য-জাড্য ফেলে ম্যানুয়েল নয়ারকে মাঠে (এবং পথে!) বসিয়ে মাথার ওপর দিয়ে ডানপায়ে তুলে দিয়েছিলেন বল, ছেলেখেলা যেন! বায়ার্ন মিউনিখ ভোলেনি, ফুটবলও। জোহান ক্রুয়েফের মতো পেনাল্টি-পাস থেকে সুয়ারেজকে দিয়ে গোল করিয়েছেন। এবার পানেনকা ফ্রিকিক।

বিশ্ব বিস্মিত করে যেমন, মেসিও। তাই কবীর সুমনের গানের কলি ধার করে বলতে হয়, ‘প্রতিদিন সূর্য ওঠে তোমায় দেখবে বলে’, মেসি!

বালিকা-মন ধরে ফেলল ছবিতে, টুইটার থেকে

Kashinath Bhattacharjee
Covered two FIFA World Cups in Brazil (2014) and Russia (2018), UEFA Champions League Final in Moscow (2008). In Sports Journalism since 1993. twitter: @bkashi
https://www.facebook.com/kashinath.bhattacharjee

4 thoughts on “সব ভয়ঙ্কর-বীভৎস-ভীষণ-এর বিরোধিতায় এবার পানেনকা ফ্রিকিক মেসির

  1. অসাধারণ সুন্দর লেখা। মনে হলো চাক্ষুষ করছি। আপনার আরো আরো সুন্দর লেখার জন্য অপেক্ষা করবো।

  2. মেসি র বাঁ পা ছবি আঁকে । একটা চর্মগোলকের ঠিক কোন জায়গায় কত জোরে টোকা মারলে তা জ্যামিতি আর পদার্থবিদ্যার সমস্ত নিয়ম কানুন অাপাত অগ্রাহ্য করে কাঙ্খিত পথে ঠিকানায় পৌঁছে যায় তা শুধু শিল্পী ই জানে । ওসব বিভৎস ভয়ঙ্কর শক্তিশালী ফুটবলারদের কম্ম নয়। সুমন এর কথাতেই বলি “ তোমাকে অভিবাদন, প্রিয়তম “

    1. অযথা বিতর্কে না গিয়ে মেসিকে বা মেসিদের শুধু দেখে যাওয়া উচিত, উপভোগ করা উচিত মুহূর্তগুলো, ব্যস… থ্যাঙ্কু থ্যাঙ্কু… 🙂

Leave a Reply