টানা ৮ বলে ৪২, আবার আন্দ্রে ‘অমানুষিক’ রাসেল!

Spread the love

কাশীনাথ ভট্টাচার্য

কলকাতা, ২৭ মার্চ ২০১৯

আন্দ্রে রাসেল, আবার!

১৭ বলে ৪৮ রান। পাঁচটা ছয়, তিনটি বাউন্ডারি। সঙ্গে ক্রিস গেইলের উইকেট পঞ্চম ওভারে, সরফরাজ খানের উইকেট সপ্তম ওভারে। তিন ওভারে মাত্র ২১ রান দিয়ে। নীতিশ রানা এবং রবিন উথাপ্পার দুর্দান্ত ব্যাটিং, সুনীল নারিনের বিস্ফোরক এক ওভারে ২৪ রান নেওয়া সত্ত্বেও, ঘরের মাঠে কলকাতা নাইট রাইডার্সকে ২৮ রানে জেতানোর পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান নিঃসন্দেহে অবিশ্বাস্য রাসেলের, আবার!

অথচ, পাঁচ বলে তিন রান করে আউট হয়ে গিয়েছিলেন ক্যারিবিয়ান অলরাউন্ডার। মহম্মদ শামির ইয়র্কারে সম্পূর্ণ পরাস্ত হয়ে। কিন্তু, টোয়েন্টি টোয়েন্টি ক্রিকেটে বৃত্তের মধ্যে চারজন ফিল্ডার যে-সময় থাকা বাধ্যতামূলক, রবিচন্দ্রন অশ্বিনের গুনতিতে ভুল। ছিলেন তিনজন। আম্পায়ার নো বল ডাকেন। প্যাভিলিয়নের দিকে হাঁটতে শুরু করা রাসেলকে ফিরিয়ে আনা হয় ১৭তম ওভারের পঞ্চম বলে, ‘ফ্রি হিট’-এর সুযোগ দিয়ে। সেই বলে ছয় মারতে গিয়েছিলেন। বাউন্ডারি লাইনে ক্যাচটা ধরার চেষ্টা করেননি অ্যান্ড্রু টাই। জানতেন, ক্যাচ নিয়ে লাভ নেই, রান আটকানোই মুখ্য।

পরের ওভারে টাইয়ের সামনে রাসেল। গতবারের আইপিএল-এ সর্বোচ্চ উইকেট ছিল অস্ট্রেলীয় টাইয়ের। প্রথম দুটি বলে রাসেল এবং উথাপ্পা একটি করে রান নিলেন। পরের চার বলে রাসেলের ব্যাট থেকে এল ৬, ৪, ৪, ৬ – মোট ২০। তারপরের ওভার, ইনিংসের ১৯তম। সামি এলেন আবার। উথাপ্পা প্রথম দুটি বলে ২ এবং ১ নিয়ে রাসেলকে স্ট্রাইক দিলেন। শেষ চার বলে রাসেল এবার ৬, ৬, ৬, ৪, মোট ২২! মানে, টানা আট বলে ৪২। অমানুষিক!

শক্তির এমন গর্বোদ্ধত প্রদর্শন বোধহয় বেশিক্ষণ চলতে পারে না বলেই ইনিংসের শেষ ওভারে আরও একটি খুচরো রানের পর ডিপ মিড উইকেট বাউন্ডারিতে ময়াঙ্ক আগরওয়ালকে ক্যাচ দিয়ে ৪৭ রানে আউট রাসেল। প্রথম ম্যাচে ১৯ বলে অপরাজিত ৪৯-এর পর দ্বিতীয় ম্যাচে ১৭ বলে ৪৭। কার্লোস ব্র্যাথওয়েটের ইডেনে টিটোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে শেষ চার বলে চারটি ছক্কা মারার ইতিহাসে আপাতত নতুন পাতা জুড়ছেন রাসেল।

আর, টানা দু-ম্যাচে জয়ের পর ঘরের মাঠে কলকাতা আবার খেলবে আগামী ১২ এপ্রিল।

নীতিশ রানার উত্থান

ব্যাট করতে এসেছিলেন ৩.৪ ওভারে, ৩৬ রানে দলের দ্বিতীয় উইকেট পড়ার পর। ১৪.৩ ওভারে আউট হলেন যখন, দল তিন উইকেট হারিয়ে ১৪৬। উথাপ্পার সঙ্গে তৃতীয় উইকেটে জুড়লেন ৬৬ বলে ১১০। যার মধ্যে রানার ৩৪ বলে ৬৩। সাত-সাতখানা ছক্কা, দুটি মাত্র বাউন্ডারি। বিশ্বকাপে অশ্বিনের ভারতীয় দলে জায়গা পাওয়ার চেষ্টা মাঠের বাইরে উড়িয়ে দিলেন শুধু অশ্বিনকেই চারটি ওভার বাউন্ডারিতে।

প্রথম ম্যাচে গতবারের ফাইনালিস্ট সানরাইজার্স হায়দরাবাদের বিরুদ্ধেও ৪৭ বলে ৬৮ করেছিলেন দিল্লির বাঁহাতি, অনভ্যস্ত ওপেনারের জায়গায়। দুটি ম্যাচ মিলিয়ে ১৩১ রান, সবচেয়ে বেশি রানের ‘অরেঞ্জ ক্যাপ’ আপাতত তাঁরই মাথায়। আর, দুটি ম্যাচেই তাঁকে বিব্রত হতে হয়নি, আউটের বলগুলো ছাড়া। এবার তো মনে রাখার মতো ক্যাচ ময়াঙ্কের। বাউন্ডারি লাইন থেকে দৌড়ে ভেতরে, প্রায় ৩০ গজের বৃত্তের কাছাকাছি এসে নেওয়া ক্যাচ। টাইমিংয়ের গণ্ডগোলে বল আকাশের দিকে উঠেছিল এতটাই ওপরে যে অতটা ছুটে এসেও সহজেই ক্যাচ নিতে পেরেছিলেন ময়াঙ্ক।

রানার এই ইনিংস, প্রথম ম্যাচের মতোই, রাসেলকে দিয়ে গিয়েছিল হাত-খোলার স্বাধীনতা। ক্রিকেট বলকে খোলামকুচির মতোই ৫১ হাজারি ইডেনের গ্যালারির চারপাশে নিয়ম করে পাঠানো!

উথাপ্পার পরিণতমনস্ক ব্যাটিং

অভিজ্ঞতার দাম দিচ্ছের উথাপ্পা। ৫০ বলে ৬৭ অপরাজিত, ছ’টা চার, দুটো ছয়। তৃতীয় ওভারে মাঠে এসে অপরাজিত থেকে ইনিংসকে দিশা দিয়ে ফেরা। শুরুতে নারিন, তারপর রানা এবং শেষে রাসেলের পেশিবহুল ব্যাটিংয়ের ছক্কা-তাণ্ডবেও যা হারিয়ে যেতে যেতেও ঠিক মাথা উঁচু করে নিজেকে চিনিয়ে রাখে। উথাপ্পা বিধ্বংসী নন। অসম্ভব কার্যকরী, এই কুড়ি-কুড়ি ওভারের টানটান উত্তেজনার মাঝে যিনি কখনও ভোলেন না ইনিংস টেনে নিয়ে যাওয়ার বাড়তি দায়িত্ব।

রাসেল যখন পরিচিত মেজাজে, একটি করে রান নিয়ে রাসেলকে স্ট্রাইক ফিরিয়ে দেওয়ার বুদ্ধিমত্তা সমান প্রশংসনীয়। প্রথম ম্যাচেও তাঁর ছিল ২৭ বলে ৩৫। ক্রিস লিন এখনও নিজেকে মেলে ধরেননি। নাইট-ব্যাটসম্যানদের তিনজনই দুদিন কাজের কাজটা ঠিকঠাক করে দিলেন।

হ্যাঁ, বোলার নারিনকে ভুলে গেলেও চলবে, কিন্তু ব্যাটসম্যান নারিনের এক ওভারের বিধ্বংসী মেজাজও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সাত রকম বল করতে পারেন, রহস্যময় স্পিনার হিসাবে উত্থান তামিলনাড়ুর বরুণ চক্রবর্তীর, এবারের আইপিএল-এ যাঁকে ৮ কোটি ৪০ লক্ষ টাকায় কিনেছিল কিংস ইলেভেন পাঞ্জাব, কলকাতার সঙ্গে লড়াই করেই। অভিষেকে, প্রথম ওভারে ২৫ রান দিয়েছিলেন। প্রথম বলে একটি রান লিনের। পরের পাঁচ বল, যা মারিনের এবারের আইপিএলে ব্যাটিংয়ে প্রথম পাঁচ বল, রান যথাক্রমে ৬, ২, ৪, ৬ এবং ৬। ওই দু-রানের সময় আবার নারিনের জোরালো শটকে ফিরতি ক্যাচ হিসাবে নিতে গিয়ে ফস্কানো। নারিন তারপর সামিকেও ফিরতি ক্যাচ দিয়েছিলেন, ধরে রাখা যায়নি। কিন্তু আর কোনও রান জুড়তে পারেননি।

ময়াঙ্ক-মিলার

সামনে ২১৯ রানের লক্ষ্য। লোকেশ রাহুল প্রথমেই আউট। ভরসা ছিলেন প্রাক্তন-নাইট গেইল। খেলার মাঠে পনিটেইল এখনও রোবের্তো বাজ্জিওকে মনে করিয়ে দেয়। সেই বাজ্জিও-র পেনাল্টি ওড়ানো ১৯৯৪ বিশ্বকাপ ফাইনালে, ব্রাজিলের গোলরক্ষক তাফারেলের মুষ্টিবদ্ধ হাত আকাশে। দুটি চার এবং দুটি ছয়ে ২০-র পর গেইলের অবস্থাও তেমন। তাঁর আউট ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে সীমাবদ্ধ থাকতেই পারত রাসেলের বলে ক্যাচটা নারিন নিলে। ছুটেছিলেন নারিন আর প্রসিধ কৃষ্ণ। শেষে প্রসিধের হাতে বল। আর, গেইলকে মারার জায়গা না দিয়ে অধৈর্য করে মারতে বাধ্য করে আউট করিয়ে ম্যাচের সেরা হওয়ার দিকে রাসেল।

কিংস লড়েছিল তারপর, হার সম্মানজনক করতে। ময়াঙ্ক (৩৪ বলে ৫৮) আর ডেভিড মিলার (৪০ বলে অপরাজিত ৫৯) সাধ্যমতো চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু, ২১৯ রানে পৌঁছতে হলে দুশোর কাছাকাছি স্ট্রাইকরেট জরুরি, অথবা গেইলের ১৫-১৬ ওভার পর্যন্ত উপস্থিতি মাঠে। কোনওটাই হয়নি।

বরঞ্চ যা হল, ষষ্ঠ ওভারের প্রথম বলে বিতর্ক। প্রসিধের বলে সরফরাজ অফের দিকে তুলে মেরেছিলেন। বল ধরার ফাঁকে একটি রান। কভার-মিড অফ অঞ্চল থেকে বলটা মিড অন অঞ্চলের ফিল্ডারের দিকে ছুড়েছিলেনও উঁচুতে, আলতো করেই, যা মিড অন অঞ্চলের ফিল্ডার দেখতে-ধরতে-বুঝতে পারেননি। তিনি মিস করেন, বল বাউন্ডারির বাইরে। আবারও ডেডবল বিতর্ক। আম্পায়াররা পাঁচ রান দিলেন দীনেশ কার্তিকের উষ্মা, তা দেখে বাউন্ডারি লাইনের বাইরে বিরক্তিতে ভ্রুকুঞ্চন অশ্বিনের। আম্পায়াররাই মেটালেন ঝামেলা। বোঝা গেল, ডেডবল বিতর্ক আপাতত ছাড়ছে না অশ্বিনকে!

ম্যাচ শেষ ওখানেই! রাসেলের বলে আউট হয়ে ফিরে যাচ্ছেন গেইল। ছবি – আইপিএল

Kashinath Bhattacharjee
Covered two FIFA World Cups in Brazil (2014) and Russia (2018), UEFA Champions League Final in Moscow (2008). In Sports Journalism since 1993. twitter: @bkashi
https://www.facebook.com/kashinath.bhattacharjee

Leave a Reply