শক্তির অসামান্য প্রদর্শনে রাসেলের অবিশ্বাস্য ব্যাটে ৬ উইকেটে জয়

Spread the love

কাশীনাথ ভট্টাচার্য

কলকাতা, ২৪ মার্চ ২০১৯

আন্দ্রে ‘অবিশ্বাস্য’ রাসেল!

শক্তির অসামান্য প্রদর্শনে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠে ম্যাচ নিয়ে গেলেন প্রায়-অসম্ভব অবস্থা থেকে। ১‌৯ বলে অপরাজিত ৪৯, চারটি করে চার এবং ছয়। ১৮তম ওভারে সিদ্ধার্থ কলের বলে নিয়েছিলেন তখনও পর্যন্ত ম্যাচের সবচেয়ে বেশি ১৯ রান। পরের ওভারে সানরাইজার্সের অধিনায়ক ভুবনেশ্বর কুমারের থেকে২১, ম্যাচে এক ওভারে সর্বোচ্চ। শেষ ওভারে ১৩ চাই, রাসেলের এক রানের পর চার-ছয়ের খেলায় শুভমান গিল ম্যাচ শেষ করলেন সাকিব আল হাসানকে দুটি ছয় মেরে, দু-বল বাকি থাকতেই। শেষ ১৬ বলে ৫৪ রান তুলে ৬ উইকেটে ম্যাচ জিতে এবারের আইপিএল শুরু করল কেকেআর, মালিক শাহরুখ খানের সরব-সহাস্য উপস্থিতিতে!

তার আগে দুই বাঁহাতির ব্যাটিং দাপট দেখছিল আরও এক বাঁহাতি সৌরভ গাঙ্গুলিরর মাঠ, সিএবি-সভাপতির অনুপস্থিতিতে। ইডেনে হাইকোর্ট প্রান্তের আলোকস্তম্ভের আলো কমে যাওয়ার ১৪ মিনিট পর খেলা শুরু হতেই রশিদ খানের বলে এলবিডব্লু নীতিশ রানা। কলকাতা নাইট রাইডার্সের রান তখন ১১৮, ঠিক যে রানে প্রথম উইকেট পড়েছিল সানরাইজার্স হায়দরাবাদের। কিন্তু, ওই আলো কমে যাওয়ার পরই পাল্টে গেল ম্যাচ। ডানহাতি রাসেল ম্যাচ লিখে নিলেন নিজের নামে!

ম্যাচে ৩৬৪ রান

দ্বাদশ মরসুমের শুরুটা আইপিএল-এর পরিচিত মেজাজে হয়নি। বিরাট কোহলির র‍য়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু ৭০ করেছিল প্রথমে ব্যাট করে, শনিবার। খানিকটা কষ্ট করে হলেও মহেন্দ্র সিং ধোনির চেন্নাই সুপার কিংস ঘরের মাঠে ম্যাচ জেতে অনায়াসে। দুই অধিনায়কই উইকেটের সমালোচনা করেছিলেন। ইডেনের উইকেট অবশ্য তেমন কোনও আক্ষেপ রাখল না। ১৮২ তাড়া করে ১৮৩, ৩৯.২ ওভারে ৩৬৪ রান, গোটা চারেক দুরন্ত ইনিংস, কিছু ক্যাচ মিস, কয়েকটি দুরন্ত বল এবং অবশ্যই শেষ ওভারে ১৩ রান তুলতে হওয়ার টেনশন। ছুটির রবিবার-বিকেলে ৫৮ হাজারের গ্যালারি বাড়ি ফিরল উপভোগ্য ম্যাচের আনন্দ নিয়ে তৃপ্ত হয়েই!

উত্তরপ্রদেশের হয়ে মুম্বইয়ের বিরুদ্ধে ২০১৬-১৭ রনজি ট্রফিতে প্রথমবার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ভুবনেশ্বর। কলকাতায় টস করতে গেলেন দ্বিতীয়বার। টস হারলেন, এক ওভারে সবচেয়ে বেশি ২১ রান দিয়েম্যাচও হারলেন ভুবি!

ওয়ার্নারের প্রত্যাবর্তন

‘রিংলিডার’ বলা হয়েছিল ডেভিড ওয়ার্নারকে। বল-বিকৃতি চক্রান্তের খলনায়ক!

ঠিক এক বছর আগের ঘটনা। কেপ টাউনের নিউল্যান্ডস-এ। দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে টেস্ট খেলছিল অস্ট্রেলিয়া। বোলার ক্যামেরন ব্যানক্রফটকে দিয়ে বল বিকৃত করানো হয়েছিল। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার তদন্ত এবং সিদ্ধান্তে ব্যানক্রফট নির্বাসিত  ৯ মাস। অধিনায়ক স্টিভ স্মিথ এবং সহ অধিনায়ক ডেভিড ওয়ার্নারকে এক বছর, ২০১৮-র ২৪ মার্চ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড সঙ্গে সঙ্গেই জানিয়ে দিয়েছিল, ২০১৮ আইপিএল-এ খেলতে দেবে না স্মিথ এবং ওয়ার্নারকে, যা নিয়ে স্মিথের গোঁসা। অস্ট্রেলীয়দের এমন গোঁসা অবশ্য হয়েই থাকে বেআইনি কাজ করে ধরা পড়লেই!

মুখে নয়, ওয়ার্নার জবাব দিয়েছিলেন ব্যাটে। ৫৩ বলে ৮৫, বাউন্ডারি ৯, তিনটি ছক্কা, ৩১ বলে আইপিএল-এ ৩৭তম অর্ধশতরান, পেরিয়ে গেলেন গৌতম গম্ভীরকে (৩৬), অর্ধশতরানের হিসাবে। টম মুডি বলেছিলেন, নেতৃত্বের অনেকগুলো ভাগ থাকে, ওয়ার্নার মাঠে নেতৃত্ব দেবে ব্যাট করার সময় তো বটেই, আরও অনেকভাবেই। দলের বোলিংয়ের সময়ও দেখা গেল, বিশেষত ভুবনেশ্বর কুমার যখন বল করছেন, ফিল্ডিংয়ে পরিবর্তন করছেন। তার চেয়েও বড়, খেলার জন্য মুখিয়ে রয়েছেন, বোঝাল তাগিদ।

পঞ্চাশে পৌঁছেছিলেন ছয় মেরে। সেই ছয় রাসেলের বলে আপারকাট, থার্ডম্যানের মাথার ওপর দিয়ে। শট নেওয়ার সময় দুটো পা-ই শূন্যে! ২১ আর ৬৮ রানে দুবার ক্যাচ পড়েছিল। দ্বিতীয় ক্যাচটা নাইটদের অধিনায়ক দীনেশ কার্তিক কী করে যে ফেলেছিলেন!

১৬তম ওভারের শেষ বলে তিনি আউট হওয়ার সময় সানরাইজার্স হায়দরাবাদের রান ১৪৪। ইনিংস শেষ হল পরের চার ওভারে আরও ৩৭ রান জুড়ে, যার সিংহভাগ কৃতিত্ব অবশ্যই বিজয় শঙ্করের।  ২৪ বলে ৪০ রান, দুটি চার এবং দুটি ছয়, সঙ্গে প্রাক্তন নাইট মণীশ পাণ্ডের পাঁচ বলে ৮। কিন্তু, হায়দরাবাদকে যথেষ্ট ভাল জায়গায় নিয়ে যাওয়ার কৃতিত্বের দাবিদার ইনিংসের শুরুতে ওয়ার্নারের সঙ্গে জনি বেয়ারস্টোও। ইংরেজ বেয়ারস্টোর ৩৫ বলে ৩৯, প্রথম উইকেটের জুটিতে ১২.৫ ওভারে ১১৮। যেভাবে খেলছিলেন দুজনে, আরও বড় রানের কথা ভাবতেই পারত সানরাইজার্স। কিন্তু পীযুষ চাওলার গুগলিতে বোল্ড বেয়ারস্টো। তাঁর কারণেই প্রথম এগারয় থাকতে পারলেন না ঋদ্ধিমান সাহা। আর বেয়ারস্টো বুঝতে দিলেন না হায়দরাবাদের ইনিংসের শুরুতে শিখর ধাওয়ানের অভাবও।

কেকেআর-এর চমক রানা

ওয়ার্নারের সজোরে ড্রাইভ ধরতে গিয়ে আঙুলে চোট পেয়েছিলেন সুনীল নারিন। বল যদিও করেছিলেন তারপর, ইনিংসের শুরুতে তাঁকে পাঠানো সম্ভব হয়নি। অথচ, ওভার-প্রতি নয়ের বেশি রান তুলতে হবে। কলকাতার অন্যতম ভরসা ছিলেন ক্রিস লিন যিনি পারেননি রবিবার। কিন্তু লিন ও নারিনের অভাব ঢেকে দিতে তৎপর হলেন রানা, কলকাতার দল পরিচালন সমিতির চমক যিনি এই ম্যাচে। অতীতে এমনই কোনও এক পরিস্থিতিতে ইনিংসের শুরুতে এসে যেভাবে নারিন ভরসা হয়ে উঠেছিলেন, সুযোগ পেয়ে পূর্ণ সদ্ব্যবহার করলেন নীতিশও।

৪৭ বলে ৬৮ রানের ইনিংসে আটটি চার, তিনটি ছয়। ৮৫ রানের ইনিংসে ওয়ার্নার মাত্র একটি বেশি বাউন্ডার ছিল, এই তথ্যই পরিষ্কার, কেকেআর-কে ম্যাচে কীভাবে রেখে দিচ্ছিলেন দিল্লির বাঁহাতি। এবং, আউট হওয়ার আগে কোনও সুযোগ দেননি। আলো কমে যাওয়ার কারণে বিরতিতে মনঃসংযোগেও বিরতি। খেলা শুরু হওয়ার ঠিক পরের বলেই উইকেটের সামনে তাঁর পা পেয়ে গিয়েছিলেন রশিদ খান। মনে করা হয়েছিল, কেকেআর-এর যাবতীয় সম্ভাবনা শেষ।

ম্যাচের সেরা রাসেলকে কেন কেকেআর এত গুরুত্ব দেয়, পরিষ্কার পরের চার ওভারে। বল হাতে ওয়ার্নার এবং ইউসুফ পাঠানের উইকেট নিয়েছিলেন, চোটের কারণে বলের গতি অনেকটাই কমে যাওয়া সত্ত্বেও। পরে, ব্যাট হাতে অবিশ্বাস্য ইনিংস বলে গেল, তাঁকে নিয়ে আরও বেশি ভাবতে বাধ্য হবেন বাকি অন্তত ১৩ ম্যাচের বিপক্ষ-অধিনায়করা।

ম্যাচের সেরা আন্দ্রে রাসেলের সঙ্গে শুভমান গিল। ছবি – আইপিএল

Kashinath Bhattacharjee
Covered two FIFA World Cups in Brazil (2014) and Russia (2018), UEFA Champions League Final in Moscow (2008). In Sports Journalism since 1993. twitter: @bkashi
https://www.facebook.com/kashinath.bhattacharjee

Leave a Reply