‌পাঁচ গোল দিয়ে তিনে ইস্টবেঙ্গল

Spread the love

কাশীনাথ ভট্টাচার্য

কলকাতা, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

ইস্টবেঙ্গল – ৫ শিলং লাজং – ০
(লালদানমাউইয়া ৮, ২৭, ৬১, জবি ২৮, এনরিকে ৪৫)

শেষ দিকে এসে পিছলে পড়া নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছিল ইস্টবেঙ্গলের। ১৫ বছর জাতীয় বা আই লিগ না–‌পাওয়ার অন্যতম কারণ। এবার অন্তত পাঁচ ম্যাচ বাকি থাকতে তেমন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে নিজেদের প্রায় পঁচিশ হাজার সমর্থকের সামনে পাঁচ গোল দিয়ে তৃতীয় স্থানে উঠে এল ইস্টবেঙ্গল। সম্ভবত, আই লিগে এবার সেরা ম্যাচ খেলে, সবচেয়ে বড় ব্যবধানে জয় পেয়ে।
হ্যাটট্রিক করে নায়ক হয়ে গেলেন আইজল থেকে ২০০ কিলোমিটার দূরের গ্রামের লালদানমাউইয়া রালতে, যিনি মাতৃভাষা ছাড়া আর কোনও ভাষাতেই কথা বলতে পারেন না। অল্প ইংরেজি বোঝেন, কিন্তু সাংবাদিক সম্মেলনে সতীর্থকে সঙ্গে নিয়ে আসেন, তাঁর কথা সংবাদমাধ্যমের কাছে পৌঁছে দিতে। বাবা–‌মা’‌কে উৎসর্গ করলেন জয় এবং হ্যাটট্রিক। ফুটবল মাঠে অবশ্য তিনকাঠিতে বল পাঠাতে তাঁর দুই পা এবং বুদ্ধিদীপ্ত মাথাই যথেষ্ট!
লং পাসে‌
স্পেনীয় কোচের প্রশিক্ষণে ইস্টবেঙ্গল ছোট পাস খেলছে যেমন, লং পাসও খেলছে প্রচুর। পাঁচ গোলের মধ্যে একটি সেট পিস থেকে। বাকি চারটির সময়ই আসল কাজ কিন্তু করেছিল লম্বা পাস। কখনও মাঝমাঠ থেকে, কখনও আবার আরও পেছন থেকে। কাসিম আইদারা, অধিনায়ক লালরিনদিকা রালতে, বোরখা গোমেজরা বিপক্ষ রক্ষণকে বিপাকে ফেলছেন লম্বা বল বাড়িয়ে। আর লালদানমাউইয়া, এনরিকে এসকেদা, জবি জাস্টিনরা তৎপর থাকছেন সেই বল কাজে লাগাতে।
সত্যিই হয়ত শিলং লাজংয়ের বিরুদ্ধে তেমন বড় পরীক্ষা হয়নি ইস্টবেঙ্গলের। সামনে আরও শক্তিশালী দলগুলি অপেক্ষায়। কিন্তু, বাকি দলগুলির কাছে বার্তা পরিষ্কার। ভুল করলে বড় শাস্তি পেতে হতেই পারে!
‌প্রথম দলে ফিরে এসেছিলেন মনোজ মহম্মদ ও এনরিকে এসকেদা, যথাক্রমে কমলপ্রীত সিং ও খাইমে সানতোস কোলাদোর জায়গায়। যদিও এসকেদা পেছনেই খেলছিলেন, জবিকে একা স্ট্রাইকারের ভূমিকায় থাকতে হয়নি। দুজনেই নিয়মিত জায়গা বদল করলেন, তাঁদের সামলাতে হিমসিম লাজং–‌রক্ষণ।
যেভাবে গোল
প্রথম গোল, ৮ মিনিটে — লালরিনদিকা রালতের কর্নারে মাথা ছুঁইয়ে প্রথম গোল লালদানমাউইয়া রালতের গোল। বক্সের ঠিক মাঝখানে, বিপক্ষের সব ডিফেন্ডারের মাঝে দাঁড়িয়ে। লাজংয়ের কোচ আলিসন খারশিনতিউ নিশ্চিতভাবেই খুশি হবেন না এমন গোল হজম করে।
দ্বিতীয় গোল, ২৭ মিনিটে — বোরখা গোমেজের লম্বা পাস পেয়েছিলেন লালদানমাউইয়া। ডানপায়ে বল রিসিভ করলেন এমন, কেটে গেলেন লাজংয়ের একমাত্র ডিফেন্ডার। দেখে নিয়েছিলেন, এগিয়ে আছেন লাজংয়ের গোলরক্ষক ফুরবা লাচেনপা। দূর থেকে বাঁ পায়ে লাচেনপার মাথার ওপর দিয়ে তুলে দেন। দুর্দান্ত!‌
তৃতীয় গোল, ২৮ মিনিটে — এবার তোনি দোবালের পাস থেকে বল পেয়েছিলেন এনরিকে এসকেদা। আগুয়ান লাচেনপার মাথার ওপর দিয়ে তুলে দিতে গিয়েছিলেন। কিন্তু, দিক ঠিক ছিল না। বল উঁচু হয়ে বক্সে পড়ছে যখন, আবারও লাজংয়ের দুই ডিফেন্ডারকে টপকে লাফিয়ে কোনও রকমে মাথায় লাগিয়েছিলেন জবি জাস্টিন। এবারের আই লিগে তাঁর নবম গোল। উইলিস প্লাজার ১৭ অনেক দূর, কিন্তু ভারতীয় স্ট্রাইকারদের মধ্যে জাস্টিনই এখনও শীর্ষে।
চতুর্থ গোল, ৪৫ মিনিটে — ম্যাচের সেরা, নিঃসন্দেহে। এবারেও লং বল। পেছন থেকে দিদিকা রালতের। বুকে নামিয়ে সাইডভলিতে গোল এসকেদার। ব্যাকভলি ঠিক নয়, কারণ, শূন্যে ওঠেননি। কিন্তু, বল বুকে রিসিভ করছেন যখন, এমনকি ডানপায়ে শটও নিলেন, নিজের গোলের দিকে মুখ করেই। চোট সারিয়ে ফিরে এসেই নিয়মিত গোল পাচ্ছেন। পুরো মরসুম খেললে তিনিও হয়ত থেকে যেতেন সর্বোচ্চ গোলদাতার লড়াইয়ে।
পঞ্চম গোল, ৬১ মিনিটে — দ্বিতীয়ার্ধেও ইস্টবেঙ্গল শুরু করেছিল একই রকম দাপটে। যদিও পঞ্চম গোলের জন্য খানিক অপেক্ষা। এবার পেছন থেকে বল গিয়েছিল ডানদিক থেকে উঠতে–‌থাকা মাঠে সদ্য–‌আসা খাইমে কোলাদোর জন্য। এক ডিফেন্ডারকে টপকে এগিয়ে শট নেওয়ার ভান করে বক্সের মধ্যে বল বাড়িয়ে দিয়েছিলেন খাইমে। এগোচ্ছিলেন জবি, দু–‌পায়ের ফাঁক দিয়ে বল বেরিয়ে যেতে দেন পেছনে–‌থাকা লালদানমাউইয়ার জন্য। নিঃস্বার্থ ‘‌ডামি’‌ জবির, বল ধরে সহজেই হ্যাটট্রিক লালদানমাউইয়ার। এবারের লিগে তাঁর সপ্তম গোল। ছুঁয়ে ফেললেন মোহনবাগানের দিপান্দা দিকাকে, মিজোরামের উইঙ্গার।
লিগ তালিকায়
১৫ ম্যাচে ৩১, তৃতীয় স্থানে এখন। পেরিয়ে গেল চার্চিলকে, ১৭ ম্যাচে ৩০ নিয়ে যারা এখন চতুর্থ। পরের ম্যাচ ১৭ ফেব্রুয়ারি, রবিবার, এই চার্চিলের বিরুদ্ধেই। চেন্নাই ১৬ ম্যাচে ৩৪, প্রথম। ১৬ ম্যাচে ৩২ রিয়েল কাশ্মীরের, দ্বিতীয়। কাশ্মীরের বাতাসে বারুদের গন্ধের কারণে ২৮ ফেব্রুয়ারির ম্যাচ অন্যত্র দেওয়ার আবেদনও জানাচ্ছে ইস্টবেঙ্গল। চেন্নাইয়ের পরের খেলার আগেই চার্চিলের সামনে। এবং রবিবার জিততে পারলে লিগ শীর্ষে সমান ম্যাচ খেলে চেন্নাইকে ধরে ফেলার সম্ভাবনা ইস্টবেঙ্গলের সামনে এখন। আলেখান্দ্রো মেনেন্দেজ এই সুযোগ নিশ্চিতভাবেই হাতছাড়া করতে চাইবেন না!‌
ইস্টবেঙ্গল – রক্ষিত দাগার; লালরাম চুলোভা (সামাদ আলি মল্লিক ৪৬), জনি আকোস্তা, বোরখা গোমেস, মনোজ মহম্মদ; লালদানমাউইয়া রালতে, কাসিম আইদারা (‌প্রকাশ সরকার ৬২)‌, লালরিনদিকা লালতে, তোনি দোবালে; এনরিকে এসকেদা (‌খাইমে সানতোস কোলাদো ৫৯)‌, জবি জাস্টিন
শিলং লাজং – ফুরবা লাচেনপা; রাকেশ প্রধান (‌কিনসাইলাং খোংসিত ৪৬), নবীন রাভা, কেনস্টার খারশোং, আইবানভা দোলিং; নবীন গুরুং, এফ লালরোহলুয়া (‌ দোনবোকলাং লিংদো ৬৮)‌, স্যামুয়েল কিয়ানশি, ফারাংকি বুয়াম (‌শীন সোহকতুং ৬০)‌‌; কিৎবোকলাং পালে, নাওরেম মহেশ সিং
রেফারি – ওম প্রকাশ ঠাকুর

Kashinath Bhattacharjee
Covered two FIFA World Cups in Brazil (2014) and Russia (2018), UEFA Champions League Final in Moscow (2008). In Sports Journalism since 1993. twitter: @bkashi
https://www.facebook.com/kashinath.bhattacharjee

Leave a Reply