জবি-খাইমে জুটিতে ইস্টবেঙ্গলের ডার্বি-ডবল

Spread the love

কাশীনাথ ভট্টাচার্য

কলকাতা, ২৭ জানুয়ারি ২০১৯

মোহনবাগান – ০           ইস্টবেঙ্গল – ২

(খাইমে ৩৫, জবি ৭৬)

ডিসেম্বরে ছিল আগের সাত বড় ম্যাচ না-জেতার যন্ত্রণা। দ্বিতীয় বড় ম্যাচে ‘ডার্বি-ডবল’, তা-ও সুভাষ ভৌমিকের ১৫ বছর পর!

স্পেনীয় কোচ আলেখান্দ্রো মেনেন্দেস জিতলেন প্রথম দুটি বড় ম্যাচেই। জবি জাস্টিন গোল পেলেন দুবারই। প্রথম ম্যাচে খাইমে সানতোস কোলাদো এসে পাল্টে দিয়েছিলেন ইস্টবেঙ্গলকে, দ্বিতীয় ম্যাচে গোল পেলেন ২৩ বছরের স্পেনীয়। তবু, হিরো আই লিগে চিরশত্রুদের এ-মরসুমে দুবারই হারানোর কৃতিত্ব নিয়েও অবশ্য ১৩ ম্যাচে ২৫ পয়েন্ট নিয়ে ইস্টবেঙ্গল থাকছে তৃতীয় স্থানে, বলছে এআইএফএফ-এর ওয়েবসাইট। শীর্ষে-থাকা চেন্নাইয়ের সঙ্গে পয়েন্টের পার্থক্য এখনও পাঁচ!

আর, শিবির বদলেও পাল্টাল না খালিদ জামিলের ভাগ্য। আই লিগে তৃতীয় প্রচেষ্টায়ও ডার্বি-জয় এখনও অধরা!

শুরুতেই ধাক্কা

মোহনবাগানের প্রথম এগারয় নাম ছিল ইউতা কিনোয়াকির। সেই তালিকা পৌঁছে গিয়েছিল সংবাদমাধ্যমের কাছেও। কিন্তু, জাপানি মিডফিল্ডার চোট পেলেন কাফ মাসলে, ম্যাচ শুরুর আগে গা-ঘামানোর সময়। উগান্ডার হেনরি কিসেকা, যাঁর নাম ছিল অতিরিক্ত তালিকায়, শুরু করলেন, খানিকটা অনভ্যস্ত জায়গায়। সরাসরি দুই স্ট্রাইকারে যাননি খালিদ জামিল। দিপান্দা দিকার পেছনে খেলছিলেন কিসেকা।

খালিদ বললেন, ‘ফুটবলে এমন হতেই পারে। আমাদের প্রস্তুত থাকতেই হয়, সব পরিস্থিতির জন্যই। ইউতা থাকলে নিশ্চিতভাবেই ভাল হত। কিন্তু ও থাকলেই যা যা হয়েছে সেগুলো হত না, এমনটা জোরগলায় বলা সম্ভব নয়।’

মার্কিংয়ে সমস্যা দুটি গোলের সময়ই, যে ভুলগুলো নিয়ম ছিল শঙ্করলাল চক্রবর্তীর সময়, দুটি ম্যাচে ক্লিন শিট-এর পর ফিরল আবার বাগানে। ফলে, খেতাবি লড়াইয়ের বাইরে চলে গেল মোহনবাগান, ১৪ ম্যাচে ২১ পয়েন্ট নিয়ে, প্রায়-নিশ্চিত।

যেভাবে গোল

প্রথম গোল, ৩৫ মিনিটে : রক্ষণ থেকে লম্বা বল জবির উদ্দেশে। কিংসলে গায়ে লেগেই ছিলেন। ভেবেছিলেন, জবি পেছনেই থাকবেন। কিন্তু পেছন থেকে বেরিয়ে আসেন সাদা চুলের জবি এবং বক্সের মধ্যে ফাঁকায় পাস রাখেন খাইমে কোলাদোর জন্য। ২৩ বছরের স্পেনীয় মাথা ঠাণ্ডা রেখে গুরজিন্দরকে ডানপায়ে ইনসাইড ডজে পেরিয়ে বাঁপায়ে বল রাখেন জালে। গোলরক্ষক শিলটনের থেকে অতটা দূরে থাকা সত্ত্বেও কিংসলে কেন হঠাৎ গতি কমিয়ে বল ছেড়ে দিয়েছিলেন, নিজের পায়ে বল না-থাকা সত্ত্বেও, বোঝা কঠিন।

দ্বিতীয় গোল, ৭৬ মিনিটে : নিখুঁত সেট পিসে গোল। লালরিনদিকা রালতে কর্নার রেখেছিলেন বক্সের মধ্যে। দুই স্টপারের মাঝে জবির মাথায়, ব্যাক ফ্লিক এবং জবির আই লিগে অষ্টম গোল এবার। কর্নার পাওয়ার পর মোহনবাগান বক্সে মার্কিং নিয়ে খানিক জটলা। রেফারি বেশ খানিকক্ষণ অপেক্ষার পর অনুমতি দিয়েছিলেন শট নেওয়ার। জবি বুদ্ধি করে আগেই বেরিয়ে এসেছিলেন, থমকে দাঁড়ান, বল পেয়ে যান মাথায়।

মোহনবাগানের অসন্তোষ

একগোলে পিছিয়ে দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে তেড়েফুঁড়ে শুরু করেছিল মোহনবাগান। দুটি ব্যাপারে তারা প্রতিবাদ জানিয়েও ছিলেন। ৫১ মিনিটে তখনও পর্যন্ত ম্যাচের একমাত্র গোলদাতা খাইমে দৃষ্টিকটুভাবে দিপান্দার ঘাড়ে ধাক্কা দেন, হাত দিয়ে। জনি আকোস্তার সঙ্গে সংঘর্ষে মাটিতে পড়েছিলেন দিপান্দা। তাঁর পা বিপজ্জনকভাবে উঠেছিল, ঠিক। কিন্তু, গোলের সামনে স্ট্রাইকাররা ওভাবে পা তুলবেনই। কোলাদো পেছন থেকে এসে দিপান্দার ঘাড় ধরে কিছু বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন। রেফারি কাছেই ছিলেন, কার্ড দেখাননি।

তার দুমিনিট পরই লালহলুদের জালে বল পাঠিয়েছিলেন দিপান্দা। সোনির কর্নারে কিংসলের হেড বারে লেগে ফিরছিল যখন, দারেন কালদেইরা ফিরতি বলে মাথা নিচু করে কোনও রকমে রাখতে চেয়েছিলেন। পাশেই ছিলেন দিপান্দা, যিনি জালে বল পাঠাতে ভুল করেননি। কিন্তু, সহকারী রেফারি আগেই পতাকা তুলে জানিয়ে দিয়েছিলেন, অফসাইডে ছিলেন কালদেইরা।

খেতাবি লড়াইয়ে ইস্টবেঙ্গল?

হাতে সাত ম্যাচ। রিয়েল কাশ্মীর, মিনার্ভা এফসি এবং গোকুলমের বিরুদ্ধে খেলতে হবে বাইরে। বাকি চার ম্যাচ যুবভারতীতে, যথাক্রমে নেরোকা, লাজং, চার্চিল ব্রাদার্স এবং আইজলের বিরুদ্ধে। চারটি ম্যাচ জিতলে ১২ পয়েন্ট নিয়ে ৩৭। কিন্তু, চার্চিল ব্রাদার্স যথেষ্ট ভাল জায়গায়, একই কথা প্রযোজ্য রিয়েল কাশ্মীর সম্পর্কেও যারা যুবভারতীতে আটকে দিয়েছিল আলেখান্দ্রোর ইস্টবেঙ্গলকে। কাজটা কঠিন তো বটেই। সঙ্গেই চোখ রাখতে হবে চেন্নাই সিটি এফসি-র দিকেও, এই মুহূর্তে যারা ছুটছে দুর্বার গতিতে। আলেখান্দ্রো  আগে বলেছিলেন, মার্চ মাসে গিয়ে দেখতে চান, তালিকায় তাঁদের অবস্থান। রবিবারও জানালেন, কোনও ‘ম্যাজিক-পয়েন্ট’ ভাবনায় নেই। ম্যাচগুলো নিয়েই ভাবতে চাইছেন। খেতাবি লড়াইয়ে থাকা সব দলই পয়েন্ট হারাবে, তিনি নিশ্চিত। সেই তালিকায় যে ইস্টবেঙ্গলও আছে!

লালহলুদের কৌশল

চুলোভা বিশেষ নড়াচড়া করতে দেননি সোনিকে। বোরখা গোমেস ইন্ডিয়ান অ্যারোজের বিরুদ্ধে ম্যাচের সেরা, মোহনবাগানের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই বল ওড়াতে ব্যস্ত! মনোজ মহম্মদ আগের ম্যাচে লাল কার্ড দেখায় সুযোগ এসেছিল কমলপ্রীত সিংয়ের কাছে, যিনি ভরসা দিলেন রক্ষণকে এতটাই যে, কোচ স্বীকার করে গেলেন, ‘মনোজকে এখন বাড়তি পরিশ্রম করতে হবে প্রথম দলে আসতে, যা আমাদের দলের পক্ষে নিশ্চিতভাবেই ভাল খবর।’ মরসুমে ১৩-র মধ্যে মাত্র তৃতীয় ম্যাচে গোল খেল না ইস্টবেঙ্গল, প্রথম ম্যাচে নেরোকা এবং গত ম্যাচে অ্যারোজের পর।

কৌশল? মাঝমাঠে রক্ষণাত্মক ভূমিকায় কাসিম আইদার বড় শরীরের সুবিধা নিচ্ছেন, আটকাচ্ছেন বিপক্ষের আক্রমণ। সঙ্গে অধিনায়ক দিদিকাও। আক্রমণাত্মক ভূমিকায় দুই স্পেনীয় খাইমে এবং তোনি দোবালের মধ্যে বোঝাপড়া আরও ভাল হওয়া সম্ভব যেমন, দোবালে ডানদিকে জায়গা বদলে গিয়ে বাঁপায়ে বল নিয়ে অসুবিধায় পড়ছেন। ছোট পাসে খেলতে গিয়ে অনেক সময় ভুল পাস হচ্ছে, আরও শক্তিশালী বিপক্ষ যার সুবিধা নিতেই পারে।

সবচেয়ে বড় অবশ্যই জবির ফর্ম। প্রতিদিন উন্নতি করছেন। সারাক্ষণ তাড়া করছেন বিপক্ষ রক্ষণভাগের ফুটবলারদের, যার সুফল পেয়েছিলেন প্রথম গোলের সময়। এক স্ট্রাইকারে তাঁর নিরন্তর নড়াচড়া বিভ্রান্তি বাড়াচ্ছে বিপক্ষের, ফসল তুলছে দল। নিজেই জানালেন, আপাতত এভাবেই খেলে যাওয়া আর কিছুই ভাবনায় নেই তাঁর। কোচ অবশ্য যোগ করলেন, এভাবেই যদি খেলে যায়, জাতীয় দলের জার্সি গায়ে উঠতেই পারে জবির, কারণ, ‘ফুটবলার হিসাবে সম্পূর্ণ হয়ে উঠছে। বক্সের ভেতরেই শুধু নয়, বাইরেও। দলকে সাহায্য করছে মাঠের সর্বত্র।’

যুবভারতীতে প্রথম বড় ম্যাচে ৬৪,৮৬৭ দর্শকের পর এবার ৬২ হাজার ৬২৯ জনের উপস্থিতি। ভারতীয় ফুটবলের সেরা লিগের সেরা বিজ্ঞাপন, নিঃসন্দেহে!

মোহনবাগান – শিলটন পাল; অভিষেক আম্বেকার (অরিজিৎ বাগুই ৮৯), এজে কিংসলে, লালছনকিমা, গুরজিন্দর কুমার; ওমর এল হুসেইনি, দারেন কালদেইরা (তীর্থঙ্কর সরকার ৮২), পিন্টু মাহাতো (শেখ ফৈয়জ ৫১), সোনি নর্দে; দিপান্দা দিকা, হেনরি কিসেকা

ইস্টবেঙ্গল – রক্ষিত দাগার; লালরাম চুলোভা, জনি আকোস্তা, বোরখা গোমেস, কমলপ্রীত সিং; লালরিনদিকা রালতে, কাসিম আইদারা; লালদানমাউইয়া রালতে (ব্র্যান্ডন ভ্যানলালরেমদিকা ৬৪), তোনি দোবালে (এনরিকে এসকেদা ৭৯) খাইমে সানতোস কোলাদো (সামাদ আলি মল্লিক ৯০); জবি জাস্টিন

রেফারি – রামস্বামী শ্রীকৃষ্ণ

Kashinath Bhattacharjee
Covered two FIFA World Cups in Brazil (2014) and Russia (2018), UEFA Champions League Final in Moscow (2008). In Sports Journalism since 1993. twitter: @bkashi
https://www.facebook.com/kashinath.bhattacharjee

Leave a Reply