আজ শারজায় ইতিহাসের হাতছানি, বাঙালি প্রণয়ের নেতৃত্বে?

Spread the love

কাশীনাথ ভট্টাচার্য

কলকাতা, ১৪ জানুয়ারি ২০১৯

শারজা মানেই চেতন শর্মার শেষ বলে জাভেদ মিয়াঁদাদের সেই ছক্কা!

ইতিহাস বলছে, অস্ট্রেলেশিয়া কাপের সেই ফাইনাল হয়েছিল ১৮ এপ্রিল, ১৯৮৬। মাঝে ৩২ বছর ৯ মাস প্রায়। সুনীল ছেত্রীরা কি পারবেন শারজার দুঃসহ স্মৃতি চিরতরে ভুলিয়ে দিতে, সোমবার?

মাঠ আলাদা। শারজার ক্রিকেট স্টেডিয়াম যেখানে ক্রিকেটার্স বেনিফিট ফান্ড সিরিজ (সিবিএফএস) অনুষ্ঠিত হত আবদুল রহমান বুখাতিরের তত্ত্বাবধানে, আসিফ ইকবালের পরিচালনায়, এখনও আছে। ক্রিকেট ম্যাচ হয়। আর, এএফসি এশিয়ান কাপে বাহরিনের বিরুদ্ধে ভারত খেলবে শারজা স্টেডিয়ামে যা আদতে মাল্টি-পারপাস স্টেডিয়াম এবং শারজা এফসি-র ঘরের মাঠ, প্রধানত ফুটবলই হয় সেখানে।

সংযুক্ত আরব আমিরশাহির এই শারজা স্টেডিয়ামেই সম্ভবত বাঙালি প্রণয় হালদারের নেতৃত্বে সোমবার ভারতের সামনে ইতিহাসের হাতছানি! গুরপ্রীত সিং সাঁধু এবং সুনীল ছেত্রীর পর, তৃতীয় ম্যাচে আর্মব্যান্ড প্রণয়ের, শোনা যাচ্ছে। আগের ম্যাচে আমিরশাহির বিরুদ্ধে ভাগ্যের বিড়ম্বনা ভুলে ইতিহাস লেখার দিনে কাণ্ডারি কি তা হলে এক বাঙালিই?

সামনে বাহরিন। ঠিক আট বছর আগে, ১৪ জানুয়ারি ২০১১, এই বাহরিনের কাছেই ২-৫ হার দোহায়। মাঝের এই আট বছরে অনেক কিছুই বদলেছে। যেমন, ভারত এখন ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে ৯৭ এবং বাহরিন ১১৩। থাইল্যান্ড ছিল ১১৮তম, তাদের ৪-১ হারিয়েছিলেন সুনীলরা। বাহরিন এখনও পর্যন্ত এ-গ্রুপে সবার শেষে আছে, ইউএই-র বিরুদ্ধে ড্র আর থাইল্যান্ডের কাছে হেরে। হাতে মাত্র একটিই পয়েন্ট। ভারতকে না হারালে নকআউটে যাওয়ার কোনও সম্ভাবনাই নেই।

ভারতের সম্ভাবনা

জিতলে, সরাসরি নকআউটে। হাতে ৬ পয়েন্ট। অন্য কোনও ম্যাচের ফল দেখার দরকারই নেই, প্রথম দুয়ে থাকা নিশ্চিত। এমনকি, ইউএই-থাইল্যান্ড যদি ড্র হয়, ভারত গ্রুপ শীর্ষে থেকে চলে যেতে পারবে নকআউটে, সোনায় সোহাগা!

ড্র করলে, নকআউটে যাওয়ার সম্ভাবনা। অন্য ম্যাচের তিন সম্ভাবনা মাথায় রাখলে, ইউএই-থাইল্যান্ড ড্র হলে তিন দলের পয়েন্ট ৪, মুখোমুখি এবং গোল-পার্থক্য ঠিক করে দেবে গ্রুপে কোন দল থাকবে কোথায়। ভারত সম্ভবত তিনেই। অন্য গ্রুপগুলির চূড়ান্ত ফলের জন্য অপেক্ষা তখন। ছ’টি গ্রুপের তৃতীয় দলগুলির মধ্যে থেকে চারটি দল যাবে নকআউটে। চার পয়েন্ট তখন এগিয়ে দিতে পারে ভারতকে। ইউএই জিতলে ভারত দ্বিতীয়, থাইল্যান্ড জিতলেও।

হারলে, ভারত তবুও যেতেই পারে নকআউটে। জটিলতা বাড়বে। প্রথমত, থাইল্যান্ডকে হারতেই হবে। কারণ, বাহরিনের চার পয়েন্টের পর ইউএই-থাইল্যান্ড ড্র হলে দুটি দলের পয়েন্ট চার হয়ে যাবে, ভারত তখন চতুর্থ এবং নকআউটে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই। ইউএই-র এখনই চার পয়েন্ট, শেষ ম্যাচ ড্র হলে পাঁচ। আর থাইল্যান্ড যদি হারায় ইউএই-কে, থাইল্যান্ডের ছয়, ইউএই-র পাঁচ, বাহরিন চার, ভারতের বিদায়। সুতরাং, ভারতকে যদি হেরেও নকআউটে যেতে হয়, থাইল্যান্ডকেও হারতেই হবে। তারপর, অন্য গ্রুপের দিকে তাকানো।

সুনীল ছেত্রী

আট বছর আগের ম্যাচে গোল করেছিলেন সুনীল। এবারও কি পারবেন? এআইএফএফ-এর ওয়েবসাইটকে বলেছেন সুনীল, ‘কে গোল করল, বড় ব্যাপার নয়। আমরা গোল পেলেই হল। এই মুহূর্তে ভারতেও ফুটবল নিয়ে উৎসাহ বেড়েছে। ফুটবলের সঙ্গে যাঁরা যাঁরা জড়িত, কৃতিত্ব সবার। কিন্তু, এখনও ব্যাপারটা ছোট পর্যায়েই আছে। মাথা নিচু করে পরিশ্রম করে যেতে হবে।  অনেকটা দূর যেতে চাই। এশিয়ায় সেরা দশে থাকতে চাই, সেরাদের সঙ্গে লড়তে চাই নিয়মিত। এখনও তার কোনওটাই হয়নি। কিছুই অর্জিত নয়। বাহরিনের বিরুদ্ধে ভাল ফল হতে পারে তার প্রথম পদক্ষেপ।’

দোহায় আট বছর আগের গোল সম্পর্কে সুনীল বলেছেন, ‘গ্রুপটা সত্যি বেশ কঠিন ছিল। অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া এবং বাহরিন। আমরা সর্বস্ব দিয়েই খেলেছিলাম। বাড়তি পাওনা ছিল দলের তিনটি গোল। বাহরিনের বিরুদ্ধে গোলটাও মনে আছে। ড্রিবল করে এগিয়ে ৩৫ গজ দূর থেকে দুর্দান্ত শট নিয়েছিল রেনেডি। বলটা বারে লেগে মাটিতে পড়ে বেরিয়ে এসেছিল। পরে, রিপ্লেতে দেখেছিলাম, বল গোললাইন পেরিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু, গোল দেওয়া হয়নি। অভিষেক (যাদব) ওই বলে শট নেয় যা আবারও বারে লেগে ফিরছিল যখন, আমার হেডে গোল!’

‘সুনীল ভারতের মেসি’

বললেন কোচ স্টিফেন কনস্টান্টাইন। প্রশংসায় ভরিয়ে দিলেন তাঁর সেরা তারকাকে। ‘ভারতের মেসি বলি সুনীলকে। দেশের হয়ে, ক্লাবের হয়ে গোল করে যাচ্ছে নিয়মিত এবং কত বছর ধরে! এভাবেই খেলে যাক, আরও বহু দিন।’

২০১৫ সালে যখন ভারতের দায়িত্ব নিয়েছিলেন, এশিয়ান কাপের জন্য যোগ্যতার্জনের কথাই ভাবা যায়নি ভারতীয় ফুটবলে। চার বছরের মধ্যে এএফসি এশিয়ান কাপের মূলপর্বে খেলা বাস্তব শুধু নয়, নকআউটে পৌঁছন আর এক পয়েন্টের অপেক্ষা। কনস্টান্টাইন অবশ্য পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন এআইএফএফ-এর ওয়েবসাইটকে, ‘ড্রয়ের জন্য কীভাবে খেলতে হয় আমি জানি না, আমার দলের কেউই জানে না। তিন পয়েন্টের লক্ষ্যেই নামব। জিতেই যেতে চাই নকআউটে। জিতলে অন্য কোনও দিকে তাকাতে হবে না যখন, সেটাই সবচেয়ে ভাল। জানি না এমন ম্যাচকেই মরণবাঁচন বলা হয় কিনা, বললে বোধহয় অতিনাটকীয় হবে!’

ফিফা র‍্যাঙ্কিং মাঠে গুরুত্বপূর্ণ নয়, সবাই বলে এসেছেন। বিপক্ষ হিসাবে বাহরিন কেমন? কনস্টান্টাইনের বিশ্লেষণ, ‘রক্ষণে খুবই ভাল, সংগঠিতও। গোল পাওয়া কঠিন। কিন্তু, আমরা শক্তিশালী রক্ষণের বিরুদ্ধেও দেখিয়েছি, গোল পেতেই পারি। সোমবারও পারব আশা করি।’

বাহরিনের বিরুদ্ধে ভারতের রেকর্ড অবশ্য খুব ভাল নয়। সাতবার খেলে একবারই জিতেছে ভারত, আরও একবার ড্র আর পাঁচবার হেরেছে। কোচ তাতেও চিন্তিত নন। ‘রেকর্ডে বিশ্বাস করি না। অনেকগুলো ব্যাপার থাকে। শেষবার যখন ওদের বিরুদ্ধে খেলেছিল ভারত, একই দল নাকি এবারও? কী পরিস্থিতিতে খেলতে হয়েছিল সে বার? এগুলো সবসময় পাল্টাতেই থাকে। আমাদের ভাবনার জায়গা একটাই, বাহরিন বেশ ভাল দল, এবারও এশিয়ান কাপের মূলপর্বে খেলার যোগ্যতার্জন করেছে, সুতরাং, ওদের কথা গুরুত্ব দিয়েই ভাবতে হবে। বিনাযুদ্ধে একটুও জমি ছাড়বে না, নিশ্চিত।’

সোমবার রাত সাড়ে ন’টায় ভারতের ফুটবলপ্রেমীরা টেলিভিশনের সামনে আবার, ইতিহাসের সাক্ষী থাকতে চেয়ে!

Kashinath Bhattacharjee
Covered two FIFA World Cups in Brazil (2014) and Russia (2018), UEFA Champions League Final in Moscow (2008). In Sports Journalism since 1993. twitter: @bkashi
https://www.facebook.com/kashinath.bhattacharjee

Leave a Reply