সুযোগ নষ্টের প্রদর্শনী, হার সুনীলদের

Spread the love

কাশীনাথ ভট্টাচার্য

কলকাতা, ১০ জানুয়ারি ২০১৯

ভারত – ০ আমিরশাহি – ২

            (মুবারক ৪২, মাবখৌত ৮৮)

আকাশ থেকে মাটিতে? একেবারেই নয়!

আবুধাবির জায়েদ স্পোর্টস সিটি স্টেডিয়ামে আয়োজক সংযুক্ত আরব আমিরশাহির বিরুদ্ধে সবই করলেন ভারতীয় ফুটবলাররা, পেলেন না শুধু গোলের দেখা। গোটা ছয়েক সুযোগ তৈরি করেও গোল করতে না-পারা অবশ্যই ব্যর্থতা, নিঃসন্দেহে। কিন্তু, ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে ৭৯ আমিরশাহির বিরুদ্ধে আক্রমণে গিয়েই গোলমুখ খুলে ফেলছে বারবার ৯৭তম স্থানে-থাকা দল, ভারতীয় ফুটবল গত বছর তিরিশে এমন দেখেছে নাকি?

বিপক্ষ কোচের আসনে ইতালীয় আলবের্তো জাক্কেরোনি। তাঁর চেয়ে ভাল বোধহয় কেউ জানে না ফুটবলের সারসত্য। সুযোগ কতগুলো তৈরি হল নয়, আসল হল, কতবার বল জড়াল বিপক্ষের জালে। যদি আশিক কুরুনিয়ান, সুনীল ছেত্রী গোল করে ফেলতেন, কী কৌশল নিতেন, দেখার সুযোগ অবশ্য পাওয়া গেল না। উল্টে, পেশাদারিত্বে এবং বিপক্ষ রক্ষণের ভুলের অপেক্ষায় থেকে নিজেদের কাজটা সুচারুভাবে সম্পন্ন করে গ্রুপ শীর্ষে উঠে এল আয়োজকরা, ৪ পয়েন্ট নিয়ে।

স্বপ্নের প্রথমার্ধ, আবার

থাইল্যান্ডের বিরুদ্ধে দ্বিতীয়ার্ধ শেষ হয়েছিল যেখানে, শুরু সেখান থেকেই।  শুরুর কয়েক মিনিট আয়োজকদের চাপ সামলে আক্রমণে গিয়ে উদান্ত-কোটাল পেলেন কর্নার। অনিরুধ থাপা বল রাখলেন ভাসিয়ে, বক্সে। সন্দেশ ঝিঙ্গনের মাথায় বল, বিপক্ষের কেউ কাছাকাছি নেই, সামনে শুধুই গোল! ঝিঙ্গন হেড করলেন বাইরে। তার চার মিনিটের মধ্যে অধিনায়কের আর্মব্যান্ডসহ সুনীল সাজিয়ে দিলেন আশিক কুরুনিয়ানকে। শটও নিয়েছিলেন আশিক। আমিরশাহির গোলরক্ষক খালিদের ছড়ানো ডান হাতে লেগে বল আবারও কর্নার!

২৩ মিনিটে আবারও উদান্ত। বল নিয়ে বাইলাইনে। আল হাসান সালেহকে ইনসাইড-আউটসাইডে বিভ্রান্ত করে পেছনে অনিরুধকে পাস। বাঁক-খাওয়ানো বল অনিরুধের, বক্সে অধিনায়কের উদ্দেশে। এবারও আমিরশাহির ডিপ ডিফেন্ডাররা জায়গায় নেই। সুনীলের মাথায় ঠিকানা-লেখা বল, সামনে একা গোলরক্ষক অসহায়। কিন্তু, আগের ম্যাচে জোড়া গোলের নায়ক এবার হেড করলেন সোজা গোলরক্ষকের হাতে!

আমিরশাহি তখন বলের দখল রাখতে ব্যস্ত। চাইছে খেলার গতি কমিয়ে দিতে, তখনই। তুলনায় অনেক ছোট চেহারার হলেও ভারতীয়রা আক্রমণে উঠছিল অত্যন্ত দ্রুত। উদান্ত আর আশিকের গতি কাজে লাগিয়ে। আরও বড়, রক্ষণে নিশ্ছিদ্র। বারবার নিচে নেমে আসছিলেন সবাই, নিজেদের রক্ষণের পেছনে খেলার সুযোগই দিচ্ছিলেন না। ফলে আমিরশাহির ফুটবলাররা ফাঁক না পেয়ে বাধ্য হচ্ছিলেন দূর থেকে শট নিতে। গুরপ্রীত সিং সাঁধুকে কোনও চাপই নিতে হয়নি বলাই শ্রেয়, ৪৩ হাজারের গ্যালারির সামনেও।

আরও সুযোগ নষ্ট

সুযোগ নষ্টের পুনরাবৃত্তি চলল দ্বিতীয়ার্ধেও। হালিচরণ নার্জারিকে বসিয়ে জেজে লালপেখলুয়াকে নামিয়েছিলেন স্টিফেন কনস্টান্টাইন, দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই। আর, জেজেও পেয়ে গিয়েছিলেন প্রথম ম্যাচের মতোই গোলে বল পাঠানোর সুযোগ। ৫৩ মিনিটে অনিরুধের পাঠানো বল খলিফা ফেরত পাঠিয়েছিলেন। বুক দিয়ে নামিয়ে অবিকল প্রথম দিনের মতোই শট নিয়েছিলেন জেজে। এবার তিনকাঠিতে থাকেনি।

দু’মিনিট পরই আয়োজকদের বাঁচায় ক্রসবার! ম্যাচের সেরা আক্রমণ। জেজে থেকে উদান্ত হয়ে সুনীল, আবার উদান্ত। ঠিক যে কোণ থেকে আমিরশাহির প্রথম গোল, উদান্ত শট নিয়েছিলেন প্রায় সেখান থেকেই। আরও ভাল শট, গোলকিপারকে পরাস্ত করে ক্রসবারের নিচের দিকে লেগে বেরিয়ে এল! থাইল্যান্ডের বিরুদ্ধে দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই গোল পেয়ে গিয়ে যতটা আত্মবিশ্বাস বেড়ে গিয়েছিল ভারতের, আমিরশাহির বিরুদ্ধে ক্রমাগত সুযোগ তৈরি করেও গোল না-পেয়ে খানিকটা দমে গিয়েছিল ভারত, অবশ্যই।

দ্বিতীয় গোলের পর খেলার ইনজুরি টাইমেও পরিবর্ত রোওলিন বোর্জেসের ফ্রি কিকে পা লাগিয়ে ফেলেছিলেন ঝিঙ্গন। কিন্তু, আবারও ক্রসবার গোলের রাস্তা আটকে দাঁড়ায় ভারতীয়দের। হয়ত অন্য কোনও দিন এমন ছ’টি সুযোগ থেকে গোটা তিনেক গোল হয়ই। আয়োজকদের বিরুদ্ধে হল না!

যেভাবে গোল

প্রথম গোল, ৪২ মিনিটে : ভারতীয় রক্ষণে প্রথম ভুল বোঝাবুঝি এবং দ্বিধার সুযোগে গোল। আনাস এডাথোডিকার উচিত ছিল বলটা বের করে দেওয়া। না করে তিনি ঢুকে এলেন ভেতরে, সন্দেশ ঝিঙ্গনকে দায়িত্ব সঁপে। মাবখৌত ডানদিক দিয়ে বল রাখলেন খালফান মুবারকের জন্য। অনিরুধ চেষ্টা করেছিলেন আটকাতে, আনাস আবারও দে্রি করে ফেললেন তেইশ বছরের মুবারকের শট প্রতিরোধে। গুরপ্রীত এগিয়ে এসেছিলেন। তাঁর বাড়ানো ডান হাতের নাগাল এড়িয়ে বল জালে।

দ্বিতীয় গোল, ৮৮ মিনিটে : পেছন থেকে লম্বা বল আবার, পাঠিয়েছিলেন আলি সালমিন। দুরন্ত প্রথম ছোঁয়াতেই বল নিয়ন্ত্রণে মাবখৌতের। ভারতের দুই সেন্ট্রাল ডিফেন্ডারই জায়গায় নেই। প্রীতম চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ট্যাকলে চলে যাওয়ায় ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। মাবখৌত দেখেশুনে সেকেন্ডের ভগ্নাংশ অপেক্ষা করে শট নেন গুরপ্রীতের ডানদিক দিয়ে জালে।

ভারত, এখন

গ্রুপে শেষ ম্যাচ বাহরিনের বিরুদ্ধে, আগামী ১৪ জানুয়ারি, শারজায়। ভারতের খেলার আগেই দুবাইতে থাইল্যান্ড ১-০ হারিয়ে দিয়েছিল বাহরিনকে। ফলে, ৪ পয়েন্ট নিয়ে আমিরশাহি শীর্ষে। আর তিন পয়েন্ট করে সংগ্রহে ভারত ও থাইল্যান্ডের, যেখানে মুখোমুখি সাক্ষাতে এগিয়ে থাকায় ভারত দ্বিতীয়।

থাইল্যান্ডকে এখন শেষ ম্যাচে খেলতে হবে আয়োজক দেশের বিরুদ্ধে, ভারতকে হারিয়ে যারা উজ্জীবিত এখন। ভারতের সামনে বাহরিন যারা দু-ম্যাচে মাত্র এক পয়েন্ট পেয়েছে। কিন্তু, ভারতকে শেষ ম্যাচে হারালে তারাও ৪ পয়েন্ট নিয়ে দাবিদার হয়ে যেতে পারে নকআউটের।

অন্তত এক পয়েন্ট জরুরি ভারতের, শেষ ম্যাচে। চার পয়েন্ট থাকলে প্রথম দুইয়ে শেষ না করতে পারলেও ছ’টি গ্রুপের তৃতীয় স্থানে-থাকা দলগুলির মধ্যে প্রথম চারটি দেশের মধ্যে থাকার সম্ভাবনা থাকবে। আর, বাহরিনকে (ফিফা র‍্যাঙ্কিং ১১৩) জিততেই হবে, নকআউটে পৌঁছতে। ভারত প্রথম দুটি ম্যাচ যেভাবে খেলল, বাহরিনকে সরাসরি হারিয়ে নকআউটের স্বপ্ন দেখা অবশ্যই সম্ভব!

ভারত – গুরপ্রীত সিং সাঁধু ; প্রীতম কোটাল, সন্দেশ ঝিঙ্গন, আনাস এডাথোডিকা, শুভাশিস বসু ; উদান্ত সিং (জ্যাকিচাঁদ সিং ৭৯), প্রণয় হালদার (জার্মানপ্রীত সিং ৮৭), অনিরুধ থাপা (রোওলিন বোর্জেস ৭০), হালিচরণ নার্জারি (জেজে লালপেখলুয়া ৪৬) ; আশিক কুরুনিয়ান, সুনীল ছেত্রী

আমিরশাহি – খালিদ এইসা; বান্দার আল আহবাবি, খলিফা মুবারক, িসমাইল আহমেদ, আল হাসান সালেহ ; ইসমাইল আল হাম্মাদি (অ), আলি সালমিন; আমের আবদুল রহমান (মোহামেদ আহমাদ ৭৫), খামিস ইসমাইল (মাজেদ হাসান ৬৩) ; খালিফান মুবারক (ইসমাইল মাতার ৮৫) ; আলি মাবখৌত

রেফারি – সেজার আর্তুরো রামোস (মেহিকো)

Kashinath Bhattacharjee
Covered two FIFA World Cups in Brazil (2014) and Russia (2018), UEFA Champions League Final in Moscow (2008). In Sports Journalism since 1993. twitter: @bkashi
https://www.facebook.com/kashinath.bhattacharjee

Leave a Reply