ফিরে দেখা – এশিয়ান কাপে ভারত

Spread the love

কাশীনাথ ভট্টাচার্য

কলকাতা, ৫ জানুয়ারি ২০১৯

এশিয়ান কাপ মহাদেশীয় প্রতিযোগিতা। আন্তর্জাতিক ফুটবলের সঙ্গে যোগাযোগ এখন বহু ভারতীয় ফুটবলপ্রেমীর। তাদের বোঝার সুবিধার জন্য বলা যেতে পারে, ইউরোপ মহাদেশে যেমন ইউরো হয়, দক্ষিণ আমেরিকায় যেমন কোপা আমেরিকা, আফ্রিকায় যেমন নেশনস কাপ, তেমনই এশিয়ায় এশিয়ান কাপ।

মহাদেশীয় কাপগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পুরনো কোপা আমেরিকা। তারপরই এশিয়ান কাপ, যা শুরু হয়েছিল ১৯৫৬ সালে। ফিলিপিন্স-এর ম্যানিলায় ১৯৫৪ সালে গঠিত হয়েছিল এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি)। প্রতিষ্ঠিত হওয়ার দু-বছরের মধ্যেই শুরু হয় এএফসি এশিয়ান কাপ, বয়সে যা ইউরো-র চেয়েও বড়!

৮ মে ১৯৫৪ সালে এএফসি তৈরির সময় প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসাবে ছিল আফগানিস্তান, বর্মা (মায়ানমার), রিপাবলিক চিন (চাইনিজ তাইপেই), হংকং, ইরান, ইজরায়েল, ইন্দোনেশিয়া, জাপান, পাকিস্তান, ফিলিপিন্স, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ ভিয়েতনাম এবং ভারত, মোট ১৩ দেশ। এখন সেখানে ৪৭ দেশ সদস্য।

প্রতিষ্ঠাতা সদস্য দেশ হওয়া সত্ত্বেও ১৯৭৪ সালে ইজরায়েলকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল এএফসি থেকে, প্রধানত রাজনৈতিক কারণে। আরব এবং মুসলিম ধর্মাবলম্বী দেশগুলো খেলতে চায়নি ইজরায়েলের বিরুদ্ধে। ফলে, ১৯৭৪ থেকে ১৯৯২-এর আগে পর্যন্ত কোনও মহাদেশীয় ফুটবল সংস্থার অধীনে ছিল না ইজরায়েল। খেলতে শুধু ফিফা পরিচালিত প্রতিযোগিতায়, জানাচ্ছে উইকিপিডিয়া। ১৯৯২ সালে ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ামক সংস্থা উয়েফায় নথিভুক্ত হয় ইজরায়েল। এখন তাই উয়েফার সদস্য, খেলে ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায়।

অথচ, এই ইজরায়েলেই ১৯৬৪ সালে তৃতীয় এএফসি এশিয়ান কাপে প্রথমবার খেলতে গিয়েছিল ভারত এবং এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে ভাল ফল করেছিল সেবার। চার দেশের প্রতিযোগিতায় সেবার গ্রুপ লিগে তিনটি ম্যাচ খেলার পর ভারতের পয়েন্ট ছিল চার। দুটি ম্যাচ জিতেছিলেন চুনী গোস্বামীরা, দক্ষিণ কোরিয়া এবং হংকংয়ের বিরুদ্ধে। হেরে গিয়েছিলেন আয়োজক ইজরায়েলের কাছে, তিনটি ম্যাচই জিতে যারা চ্যাম্পিয়ন। পয়েন্ট তালিকায় দ্বিতীয় হওয়ায় ‘রানার্স’ ভারত। ১৬-র মধ্যে ১১ দেশ সেবার প্রতিযোগিতা থেকে নাম তুলে নিয়েছিল। এশিয়ার পশ্চিমাঞ্চল থেকে মূল প্রতিযোগিতায় খেলেছিল ভারত।

১৯৬৪-র তিন ম্যাচ

তারিখ বনাম ফল ভারতীয় গোলদাতা স্টেডিয়াম
২৭ মে ১৯৬৪ দক্ষিণ কোরিয়া ২-০ আপ্পালারাজু ২, ইন্দর সিং ৫৭ মিউনিসিপ্যাল স্টেডিয়াম, হাইফা
২৯ মে ১৯৬৪ ইজরায়েল ০-২   ব্লুমফিল্ড স্টেডিয়াম, জাফা
২জুন ১৯৬৪ হংকং ৩-১ ইন্দর ৪৫, সমাজপতি ৬০, চুনী ৭৭ ব্লুমফিল্ড স্টেডিয়াম, জাফা

সেবারের ভারতীয় দল –

পিটার থঙ্গরাজ, এসএস নারায়ণ;‌ ফ্রাঙ্কো, অরুণ ঘোষ, জার্নেল সিং, মৃত্যুঞ্জয় ব্যানার্জি, সৈয়দ নঈমউদ্দিন, চন্দ্রেশেখর মেনন;‌ প্রশান্ত সিনহা, মহম্মদ ইউসুফ খান, রাম বাহাদুর, কাজল মুখার্জি;‌ চুনী গোস্বামী‌, ইন্দর সিং, সুকুমার সমাজপতি, এইচ হামিদ, অরুময়নৈগম, কে আপ্পালারাজু

কোচ:‌ হ্যারি রাইট

অধিনায়ক: চুনী গোস্বামী

১৯৮৪ – সিঙ্গাপুর, গ্রুপ বি

বাছাইপর্বে ভারত ছিল তিন নম্বর গ্রুপে। সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়া, উত্তর ইয়েমেন, মালয়েশিয়া এবং পাকিস্তান। কলকাতায় হয়েছিল বাছাইপর্বের সব খেলাই। চারটির মধ্যে তিনটিতে জিতেছিল ভারত। উত্তর ইয়েমেনের বিরুদ্ধে ৪-০, মালয়েশিয়ার বিরুদ্ধে ২-১, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ২-০। শেষ ম্যাচে দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে হেরে যায় ০-১ ব্যবধানে। কিন্তু, গ্রুপে দ্বিতীয় হওয়ায় পৌঁছে যায় মূলপর্বে।

সিঙ্গাপুরে গ্রুপ বি-তে ছিল পাঁচ দেশ। ভারতের সঙ্গে আবারও আয়োজক দেশ, সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, ইরান এবং চিন। ইরানের সঙ্গে শুধু গোলশূন্য ড্র। বাকি তিন ম্যাচে মোট ৭ গোল নিয়ে ফিরতে হয়েছিল। সে বারের প্রতিযোগিতায় একটিও গোল করতে পারেননি সাবির আলিরা।

মূলপর্বের ৪ ম্যাচ

তারিখ বনাম ফল ভারতীয় গোলদাতা স্টেডিয়াম
২ ডিসেম্বর ১৯৮৪ সিঙ্গাপুর ০-২   ন্যাশনাল স্টেডিয়াম, সিঙ্গাপুর
৪ ডিসেম্বর ১৯৮৪ ইউএই ০-২   ন্যাশনাল স্টেডিয়াম, সিঙ্গাপুর
৭ ডিসেম্বর ১৯৮৪ ইরান ০-০   ন্যাশনাল স্টেডিয়াম, সিঙ্গাপুর
৯ ডিসেম্বর ১৯৮৪ চিন ০-৩   ন্যাশনাল স্টেডিয়াম, সিঙ্গাপুর

১৯৮৪-র দল

অতনু ভট্টাচার্য, ব্রহ্মানন্দ;‌ পেম দোরজি, তরুণ দে, সুব্রত ভট্টাচার্য, কৃষ্ণেন্দু রায়, ডেরিক পেরিরা, আবদুল মজিদ;‌ প্রশান্ত ব্যানার্জি, বিকাশ পাঁজি, নরেন্দর থাপা, পারমিন্দর সিং, মরিসিও আফোন্সো, সুদীপ চট্টোপাধ্যায়;‌ কৃশানু দে, সাবির আলি (‌)‌, বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য, বাবু মানি

কোচ:‌ চিরিচ মিলোভান

অধিনায়ক: সাবির আলি

২০১১ – কাতার, গ্রুপ সি

কাতারে মূলপর্বের জন্য বাছাইপর্বে ভারত চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল এএফসি চ্যালেঞ্জ কাপ প্রতিযোগিতায় যা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ভারতে, ২০০৮ সালে। ৩০ জুলাই-১৩ অগাস্ট সেই প্রতিযোগিতায় গ্রুপ পর্বের খেলা হয়েছিল হায়দরাবাদে এবং ভারত গ্রুপের তিনটি ম্যাচসহ সেমিফাইনালও খেলেছিল গাচ্চিবোলি স্টেডিয়ামে।

ভারতের গ্রুপে ছিল আফগানিস্তান, তাজিকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তান। তাজিকিস্তানের বিরুদ্ধে ১-১ ছাড়া বাকি দুটি ম্যাচই জিতেছিল ভারত। আফগানিস্তানকে লরেন্সের গোলে হারিয়েছিল, তুর্কমেনিস্তানের বিরুদ্ধে জোড়া গোল বাইচুং ভুটিয়ার। সেমিফাইনালে মায়ানমার পরাস্ত সুনীল ছেত্রীর একমাত্র গোলে। ফাইনাল দিল্লির আম্বেদকার স্টেডিয়ামে। তাজিকিস্তানকে দাঁড়াতে দেয়নি ভারত, জিতেছিল ৪-১। হ্যাটট্রিক করেছিলেন সুনীল, বাকি গোলটি বাইচুংয়ের।

মূলপর্বে অবশ্য খুবই কঠিন গ্রুপে ভারত। অস্ট্রেলিয়া, বাহরিন এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে। তিনটি ম্যাচই হেরেছিল। সান্ত্বনা বলতে দুটি গোল পেয়েছিলেন সুনীল, আর একটি গোবিন সিংয়ের। মোট ১৩ গোল খাওয়া সত্ত্বেও ভারতের গোলরক্ষক সুব্রত পাল প্রশংসিত হয়েছিলেন সব মহলেই। তিনকাঠির তলায় সুব্রত না থাকলে গোলের সংখ্যা নাকি অনায়াসেই হতে পারত দ্বিগুণ!

মূলপর্বে অধিনায়ক বাইচুং ভুটিয়াকে পায়ইনি ভারত। আহত অবস্থাতেই বাইচুংকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তিনটির মধ্যে শেষ ম্যাচে মাত্র ১২ মিনিটের জন্য মাঠে নেমেছিলেন।  দক্ষিণ কোরিয়ার বিরুদ্ধে ৭৮ মিনিটে অভিষেক যাদবকে তুলে তাঁকে নামিয়েছিলেন কোচ হটন। মাঠে তাঁর আগে অধিনায়কত্ব করেছিলেন ক্লাইম্যাক্স লরেন্স।

মূলপর্বের তিন ম্যাচ

তারিখ বনাম ফল ভারতীয় গোলদাতা স্টেডিয়াম
১০ জানুয়ারি ২০১১ অস্ট্রেলিয়া ০-৪   জশিম বিন হামাদ স্টেডিয়াম, দোহা
১৪ জানুয়ারি ২০১১ বাহরিন ২-৫ গোবিন ৯, সুনীল ৫২ জশিম বিন হামাদ স্টেডিয়াম, দোহা
১৮ জানুয়ারি ২০১১ দক্ষিণ কোরিয়া ১-৪ সুনীল ১২ পে. আল ঘারাফাস্টেডিয়াম, দোহা

২০১১-র দল

সুব্রত পাল, শুভাশিস রায়চৌধুরি, গুরপ্রীত সিং সাঁধু;‌ গোবিন সিং, এনএস মঞ্জু, রাকেশ মাসি, আনোয়ার আলি, দীপক মণ্ডল, মহেশ গাওলি, সুরকুমার সিং, গৌরমাঙ্গি সিং;‌ বলদীপ সিং জু.‌, পি প্রদীপ, রেনেডি সিং, ক্লিফোর্ড মিরান্ডা, ক্লাইম্যাক্স লরেন্স, মেহরাজউদ্দিন, রহিম নবি, স্টিভেন ডায়াস;‌ অভিষেক যাদব, সুনীল ছেত্রী, বাইচুং ভুটিয়া‌, মহম্মদ রফি

কোচ:‌ বব হটন‌

অধিনায়ক: বাইচুং ভুটিয়া

Kashinath Bhattacharjee
Covered two FIFA World Cups in Brazil (2014) and Russia (2018), UEFA Champions League Final in Moscow (2008). In Sports Journalism since 1993. twitter: @bkashi
https://www.facebook.com/kashinath.bhattacharjee

Leave a Reply