শচীন-কাম্বলিদের আচরেকার-স্যর প্রয়াত

Spread the love

রাইট স্পোর্টস ওয়েবডেস্ক

কলকাতা, ২ জানুয়ারি ২০১৯

সাতাশি বছর বয়সে প্রয়াত হলেন রমাকান্ত আচরেকার। মুম্বইয়ের দাদারে, নিজের বাড়িতে। বার্ধক্যজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন দীর্ঘদিন। ১৯৯০ সালে দ্রোণাচার্য এবং ২০১০ সালে পদ্মশ্রী পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছিলেন আচরেকার।

ক্রিকেটকে শচীন তেন্ডুলকার উপহার দিয়েছিলেন তিনি। ২০১৩ সালে ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে নিজের শেষ টেস্ট ম্যাচ খেলার পর বিদায়ী বক্তৃতায় শচীন বলেছিলেন, ‘আমার জীবন পাল্টে গিয়েছিল ১১ বছর বয়সে যখন দাদা অজিতের (তেন্ডুলকার) হাত ধরে আমি গিয়েছিলাম আচরেকার-স্যরের কাছে, ক্রিকেট শিখতে।’ গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক অটুট ছিল শেষ দিন পর্যন্ত। শচীন ছাড়াও বলবিন্দর সিং সাঁধু, প্রবীণ আমরে, বিনোদ কাম্বলি এবং সমীর দিঘেকেও তৈরি করে দিয়েছিলেন আচরেকার, আন্তর্জাতিক আসরের জন্য।

আচরেকার-স্যর সম্পর্কে বহু গল্প, আসলে যা সত্যি ঘটনা, জানিয়েছেন শচীন নিজেই, বহুবার, বহু আসরে। যেমন, একবার আচরেকার স্যরের নির্দেশ ছিল শচীনকে গিয়ে কোনও একটি ম্যাচে ব্যাট করতে হবে চার নম্বরে। কিন্তু, সেই দিন হ্যারিস শিল্ডের ফাইনালে খেলছিল সারদাশ্রম বিদ্যামন্দির স্কুলের সিনিয়ররা। ওয়াংখেড়েতেই খেলা হচ্ছিল। শচীন ভেবেছিলেন, গ্যালারিতে বসে স্কুলকে সমর্থন করবেন। স্যরের নির্দেশ অমান্য করে সেই ছোট্ট শচীন গ্যালারি থেকে খুশি হয়েই দেখেছিল স্কুলের জয়। পরে, স্যরকে দেখতে পেয়ে তাঁকেও অভিনন্দন জানাতে গিয়ে পড়তে হয় প্রশ্নের মুখে।

শচীন জানিয়েছিলেন, ‘‘স্যর জানতেন, আমি খেলতে যাইনি। তবু, জানতে চেয়েছিলেন, খেলতে গিয়েছিলাম কিনা। যখন বলেছিলাম যে, খেলতে না গিয়ে স্কুলের সমর্থনে গ্যালারিতে চিৎকার করছিলাম, হাততালি দিচ্ছিলাম, চড় খেতে হয়েছিল। বলেছিলেন, ‘অন্যের সমর্থনে গলা না ফাটিয়ে এমন কিছুর জন্য নিজেকে তৈরি করো যাতে লোকে তোমার সমর্থনে গলা ফাটায়, হাততালি দেয়।’ ওই কথা শোনার পর আর কখনও অনুশীলনে ফাঁকি দিইনি।’

জ্বালাতন কম করেননি শচীন-কাম্বলিও! ১৯৮৮ সালে ওই হ্যারিস শিল্ডের সেমিফাইনালে সেন্ট জেভিয়ার্স হাই স্কুলের বিরুদ্ধে আজাদ ময়দানের সাসানিয়ান মাঠে দুই বন্ধু মিলে ৬৬৪ রান তুলেছিলেন জুটিতে, পরে যা স্বীকৃত হয়েছিল বিশ্বরেকর্ড হিসাবে।  শচীনের তখন ১৪ বছর দশ মাস বয়স, কাম্বলির ষোল। প্রথম দিন শেষে দুজনে অপরাজিত ছিলেন যথাক্রমে ১৯২ ও ১৮২ রানে। আচরেকার-স্যর পরের দিন সকালে মাঠে ছিলেন না। দ্বিশতরানের পরও ব্যাট করে যাচ্ছিল দুই কিশোর, মনের আনন্দে। আর, বাইরে থেকে আচরেকার-স্যরের পরামর্শে যতবারই কেউ না কেউ মাঠে আসছিল ইনিংস ছেড়ে দেওয়ার কথা বলতে, দুজনেই শুনছিল না। এমনকি, লক্ষ্মণ চৌহান, যিনি আচরেকার-স্যরের অনুপস্থিতিতে সহকারী কোচের দায়িত্ব পালন করছিলেন, বারবার চিৎকার করেই বলেছিলেন ইনিংস ছাড়ার কথা। দুজনেই শোনেননি!

বিরতিতে যখন শচীনের রান ৩২৬ এবং কাম্বলির ৩৪৯, আর কিছু করার ছিল না। মাঠের পাশে খাউ গলি-র একটি টেলিফোন বুথ থেকে দুজনে ফোন করেছিলেন আচরেকার-স্যরকে। ততক্ষণে চৌহান জানিয়ে দিয়েছিলেন কোচকে যে, ত্রিশতরান হয়ে যাওয়ার পরও ব্যাট করে যাচ্ছিল দুই কিশোর। টেলিফোনে আচরেকার-স্যর প্রথমেই জানিয়ে দেন শচীনকে যে, এক্ষুনি ইনিংস ছেড়ে দিতে হবে। শচীন আবার ফোন ধরিয়ে দিয়েছিলেন কাম্বলির হাতে। কাম্বলি জানিয়েছিলেন, আর এক রান করলেই ব্যক্তিগত ৩৫০ রানে পৌঁছবেন। স্যর শোনেননি, পরিষ্কার নির্দেশ ছিল, ইনিংস ছেড়ে দিতে হবে। ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন দুজনে। আর, পরে স্যর মাঠএ এসে দুজনকেই ভীষণ বকুনি দিয়েছিলেন, সহকারী কোচ চৌহানের শব্দে যা ‘বাম্বু’!

স্কুটারের পেছনে বসিয়ে নিতেন শচীনকে, আর এ-মাঠ ও-মাঠ ঘুরে ঘুরে ব্যাটিং করাতেন। ম্যাচ প্র্যাকটিস করতে করতেই ব্যাটিং শিক্ষা। অন্যান্য শিক্ষার্থীদের যেমন খেলার আগে শিবাজি পার্কে চক্কর মারতে হত, শচীনকে তখন করতে দেওয়া হত না। খেলা শেষে যখন কিশোর শচীন ক্লান্ত, প্যাড-গ্লাভস পরিয়ে, হাতে ব্যাট দিয়ে দৌড়তে বলতেন মাঠের চারপাশে। পরে শচীন জানাবেন, সেই অনুশীলনের উপযোগিতা বুঝেছিলেন আন্তর্জাতিক আসরে বড় ইনিংস খেলার সময়।

খেলা শেষে যদি ‘বড়া পাও’ বা ‘পানি পুরি’ খাওয়াতে নিয়ে যেতেন আচরেকার-স্যর, বুঝে নিতেন শচীন, সে দিনের খেলা ভাল লেগেছে স্যরের। মুখে যে কখনও স্যর বলতেন না ‘ওয়েল প্লেড’। তাঁর শ্রদ্ধার্ঘ্যে অবশ্য সবাই একমত, ভারতরত্ম উপহার দেওয়ার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ, স্যর।

Leave a Reply