কাশীনাথ ভট্টাচার্য : নবম ম্যাচে ইস্টবেঙ্গলের এবার প্রথম ড্র!

Spread the love

ইস্টবেঙ্গল – ১    রিয়েল কাশ্মীর – ১(জবি ৫৭)        (চুলোভা, আত্মঘাতী ৪৬)

স্কটিশ কোচ ডেভিড রবার্টসন দায়িত্বে। বোঝা সহজ, লিগ তালিকায় চোখ ফেললে। ১৮ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় স্থানে, ১০ ম্যাচে গোল খেয়েছে মাত্র ছয়। ইস্টবেঙ্গল সেখানে ৯ ম্যাচে খেয়েছে ১২ গোল! রিয়েল কাশ্মীরের আসল শক্তি ওই তথ্যে। রক্ষণ আঁটোসাটো।আই লিগের কোনও দলের খেলার সময় রক্ষণে চারজন এবং রক্ষণের ওপরে চার জন সমান্তরাল দাঁড়িয়ে, সচরাচর দেখা যায় না। আটজনের ওই পরস্পর সমান্তরাল সরলরেখায় আটকে যায় কোনাকুনি পাস। আন্তর্জাতিক স্তরে রক্ষণ-নির্ভর ফুটবল খেলে যে-ক্লাবগুলো, অহরহ দেখতে পাবেন। ভারতীয় ফুটবলে এই ছবিটা, এই চূড়ান্ত ‘ট্যাকটিকাল ডিসিপ্লিন’, একেবারেই সুলভ নয়। স্কটিশ কোচ দায়িত্বে থাকলেই তো হয় না, ফুটবলারদের অভ্যস্ত হয়ে উঠতে হয় এই ধরনের ফুটবলে। শরীর-নির্ভর খেলা, পেশাদার ফাউল, ছন্দহীন করে দেওয়া বিপক্ষকে, টানা পাস খেলে এগোতে না-দেওয়া – এগুলো এক বিশেষ ধরনের উত্তর ইউরোপীয় ফুটবলের ঘরানা যা ভারতের সবচেয়ে উত্তরের ক্লাবে এনে দিয়েছেন রবার্টসন। এবং, এই ঘরানার সঙ্গে লালহলুদের স্পেনীয় ঘরানার পজেশন-ভিত্তিক পাসিং-ফুটবল সম্পূর্ণ বিপরীত। আপাতত, এই দুই ঘরানার যুদ্ধ অমীমাংসিতই থাকল, ৩২ মিনিটে লালদানমাউইয়া রালতের ক্রসে ব্র্যান্ডন পা ছোঁয়াতে না-পারায়, ফাঁকা গোলের সামনে।আর, অ্যাওয়ে ম্যাচ থেকে পাওয়া এক পয়েন্টের কারণেই রবার্টসনের দল অভিষেক মরসুমে অর্ধেক ম্যাচ খেলে ফেলার পর পয়েন্টের হিসাবে শীর্ষে আর সর্বভারতীয় ফুটবল সংস্থার নিয়মানুসারে লিগ তালিকায় নেরোকা এবং চেন্নাই সিটির পর, তৃতীয় স্থানে। তবে, তাতে ‘খুশি’ হওয়া আটকাচ্ছে না রবার্টসনের। কেনই বা আটকাবে!

তালিকা-বিতর্ক

নেরোকা, চেন্নাই এবং কাশ্মীরের পয়েন্ট সমান। নেরোকা এবং কাশ্মীর দশ ম্যাচ করে খেলেছে, চেন্নাই খেলেছে ৯ ম্যাচ। এআইএফএফ-এর নিয়ম, যদি দুই বা ততোধিক দলের পয়েন্ট সমান হয়, তালিকায় তাদের অবস্থান নির্ধারণ করতে প্রথমে দেখা হবে পরস্পরের বিরুদ্ধে খেলার ফল। সেখানেও তিন দলই একটি করে ম্যাচ জিতেছে। হিসেব –নেরোকা-চেন্নাই ১-২ (পয়েন্ট, চেন্নাই ৩)চেন্নাই-কাশ্মীর ০-১ (পয়েন্ট, কাশ্মীর ৩)কাশ্মীর-নেরোকা ০-২ (পয়েন্ট, নেরোকা ৩)মুখোমুখি ফলাফলে তাই কোনও পার্থক্য নেই। নিয়ম বলছে, এবার দেখা হবে পরস্পরের বিরুদ্ধে খেলায় গোল-পার্থক্য। তাতে যা দাঁড়াচ্ছে –নেরোকা ৩-২, +১চেন্নাই ২-২, ০কাশ্মীর ১-২, -১অতএব, এই মুহূর্তে শীর্ষে নেরোকা, দ্বিতীয় চেন্নাই, তৃতীয় কাশ্মীর।

তালিকায় প্রথম চার দলের অবস্থান

ম্যাচে যেভাবে গোল

প্রথম গোল, ৪৬ মিনিটে :দ্বিতীয়ার্ধের শুরু। মাঝখান থেকে আভাস থাপার পাস ডানদিক থেকে আগুয়ান সুরচন্দ্র সিংয়ের জন্য। ডানদিক থেকে ক্রস রেখেছিলেন সুরচন্দ্র, বক্সে। পেছনে কোফি তেত্তেহ ছিলেন, চাপে পড়ে চুলোভা তাড়াতাড়িতে বল বের করে দিতে চেয়ে বাঁপায়ে ঠিকঠাক লাগেনি, বল জালে। ঘড়িতে তখন দ্বিতীয়ার্ধের ১৫ সেকেন্ড!দ্বিতীয় গোল, ৫৭ মিনিটে :  কর্নার পেয়েছিল ইস্টবেঙ্গল। বক্সে বল ভাসিয়েছিলেন লালরিনদিকা রালতে। হেড করেছিলেন কাসিম আইদার। বল গোলে ঢোকার মুখে গোললাইন সেভ দানিশ ফারুকের। ডান পায়ে বল আটকে বাঁ পা দিয়ে বলটা বের করে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আস্তে পুশ সোজা জবি জাস্টিনের পায়ে। ওত পেতে থাকা স্ট্রাইকারের সুযোগসন্ধানী গোল জাস্টিনের। আই লিগে তাঁর ষষ্ঠ, দ্বিতীয় স্থানে। সর্বোচ্চ উইলিস প্লাজার আট।ম্যাচের সেরা জবিও খুশি। আই লিগে ভারতীয় স্ট্রাইকার নিয়মিত গোল পাচ্ছেন, এমনও তো কমই দেখা যায়। প্লাজা, পেদ্রো, নেস্তর, দিকাদের মাঝে তিনিই একমাত্র। ‘ব্যক্তিগত লক্ষ্য নেই, দলকে জেতাতে পারলেই হল। আসলে লক্ষ্য তো একটাই, দলকে চ্যাম্পিয়ন হতে দেখা!’

ইস্টবেঙ্গলও খুশি

টানা চার ম্যাচে অপরাজিত। দল এতটাই ভাল খেলেছে যে কোচ পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, কারও অভাব অনুভব করেননি। স্বাভাবিক, কারণ, ম্যাচে কোনও পরিবর্ত ফুটবলার ব্যবহার করেননি স্পেনীয় কোচ আলেখান্দ্রো মেনেন্দেস। টানা তিনটি ম্যাচে হারের পর চারটি ম্যাচ থেকে ১০ পয়েন্ট। লিগের নবম ম্যাচে এসে প্রথম ড্র, কোচ খুশি হতেই পারেন, গোল খাওয়ার ১১ মিনিটের মধ্যেই গোলশোধ করে ফেলতে পেরে। হ্যাঁ, ঘরের মাঠে শুক্রবার জিতলে অন্তত পয়েন্টের হিসাবে সমান-সমান থাকতে পারতেন নেরোকা এবং চেন্নাইয়ের সঙ্গে। কিন্তু, কোচ তো জানিয়েই দিলেন, হিসেব মেলাবেন মার্চ মাসে!বিদেশি কোচ খেলে ফেললেন আই লিগের ন’টি দলের বিরুদ্ধে। কাদের বিরুদ্ধে খেলা সবচেয়ে কঠিন মনে হল প্রশ্নেও রিয়েল কাশ্মীরের কথা বললেন। ‘রক্ষণাত্মক দল, বেশি সুযোগ দেয় না। আমরা দাপট দেখালাম। বল পজেশন আমাদের বেশি ছিল, আক্রমণ বেশি করেছি, সুযোগও তৈরি করেছি বেশি যেমন, ওদেরও সুযোগ দিইনি তেমন। একটাই ভুল হয়েছিল গোলের সময়, কিন্তু ফিরে এসেছিলাম খেলায়, দ্রুত।’১৯ হাজার ৭৭৮ জন উপস্থিত ছিলেন যুবভারতীতে। এই দর্শকসংখ্যাই হয়ত কারণ যে, স্টার স্পোর্টস আই লিগের দ্বিতীয় পর্বের মাত্র ৩০টি খেলা সরাসরি দেখাবে। তাদের বড় সাধের আইএসএল-কে এত বেশি করে তুলে ধরেও মাঠে গড়ে দর্শকসংখ্যায় পিছিয়ে পড়তে হচ্ছে যখন, আই লিগের খেলা না-দেখানোই এখন একমাত্র পথ!ইস্টবেঙ্গল – রক্ষিত দাগার, লালরাম চুলোভা, জনি আকোস্তা, বোরখা গোমেস, মনোজ মহম্মদ, লালডানমাউইয়া রালতে, কাসিম আইদারা, লালরিনডিকা রালতে, ব্র্যান্ডন ভানলালরেমদিকা, খাইমে সানতোস কোলাদো, জবি জাস্টিনরিয়েল কাশ্মীর – বিলাল খান, ধর্মরাজ রাবণন, লাভডে ওকেচুকু, আভাস থাপা, ফারহান গনি (নগেন তামাং ৯০), আরন কাতেবে, আর্মান্দ বাজি, দিনেশ ফারুক (ঋত্বিক দাস ৭৯), সুরচন্দ্র সিং, কোফি তেত্তেহ, নোহেরে ক্রিজো (খালিদ কায়ুম ৮৫)

রেফারি – রাহুল কুমার গুপ্তা

Kashinath Bhattacharjee
Covered two FIFA World Cups in Brazil (2014) and Russia (2018), UEFA Champions League Final in Moscow (2008). In Sports Journalism since 1993. twitter: @bkashi
https://www.facebook.com/kashinath.bhattacharjee

Leave a Reply